আর কতো লাশ হলে জাগবে রাষ্ট্র?

আর কতো লাশ হলে জাগবে রাষ্ট্র?

আমরা জাতি হিসেবে এমন এক সভ্য জাতিতে রূপান্তরিত হয়েছি যে আজকাল ছোট-ছোট বাচ্চারও আমাদের কাছে নিরাপদ নয়। আমরা মানুষের প্রাণ নিয়ে খেলা করার মতো এক জঘন্য খেলায় উন্মাদ হয়ে গেছি এক সভ্য জাতি হিসেবে। আমাদের দেশের সমাজব্যবস্থা এতো নিম্নপর্যায়ের আসনে অসীন হয়েছে যেখানে ধর্ষকরা ঘুরছে চারপাশে বুকভরা সাহস আর চোখে পরবর্তী শিকারের সন্ধান নিয়ে। আর অন্যদিকে ধর্ষিতার পরিবার ঘুমরো হয়ে এক কোণে পড়ে আছে সন্তান হারানোর হাহাকারে।

ছবি: সংগৃহীত

আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থা - শাসনব্যবস্থা এতোই কঠোর এতোই উন্নত পর্যায়ের যে প্রতিদিন সকাল বেলা ঘুম ভাঙে সন্তান হারানো মায়ের আর্তনাদে। আমাদের সমাজের, রাষ্ট্রের একটি উন্নততর চিন্তা ধারা এই যে, মেয়ের পর্দা নেই, গায়ে ওড়না নেই, স্বভাব- চলন ঠিক নেই, উচ্ছৃঙ্খল চলাফেরা, পারিবারিক শিক্ষার অভাব, বাবা-মা দেখে রাখতে পারে নি তাই এমন হিংস্রতার, নরপশুর চোবলের শিকার হয়েছে! যতোদিন তাদের এই চলাফেরা চাল - চলন, গঠন - প্রণালি ঠিক হবে না তারা ততোদিন এই হিংস্রতার চোবল থেকে রেহায় পাবে না। বাহ! কী সুন্দর চিন্তা- ধারা , খুবই প্রশংসনীয়। তবে ধর্ষকদের কী? তারা যে এই ব্যবিচার চালিয়ে যাচ্ছে ,, তারা যে এই হানা দিনের পর দিন আরো হিংস্রতর করে গড়ে তুলছে তার কী? আইনব্যবস্থা এই প্রেক্ষাপটে অন্ধ কেনো?

আচ্ছা এই শিক্ষিত বিচারপতি গন্যমান্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধামন্ত্রীর কাছে একটাই প্রশ্ন থাকে যে, এই দেশের বিচার ব্যবস্থা না হয় ঐ কিশোরদের জন্য নেই কারন তাদের স্বভাব, চাল-চলন ঠিক নেই আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে, তবে এই অবুঝ শিশুরা! তাদের দোষ কী?যারা এখনো কেউ মুখের ভাষা শিখেনি, কেউ এখনো হামাগুড়ি দিচ্ছে, কেউ এখনো বাইরের জগতের এই হিংস্রতা সম্পর্কে অজ্ঞ, যারা এখনো বিদ্যালয়ের আঙ্গিনা থেকে বের হতে পারে নি, যারা এখনো মা- বাবা এর স্নেহের ছোট দেয়াল থেকে বের হতে পারে নি,, তাদের কেন ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যাচ্ছে গাছের সাথে, ধর্ষণ শেষে? কেন পাওয়া যাচ্ছে খাল-বিল, নদী- নালাতে দুর্গন্ধযুক্ত শরীর নিয়ে? কেন পাওয়া যাচ্ছে শৌচাগারে মাথা আলাদা, দেহ আলাদা হয়ে একটি ঝীর্ণশীর্ণ অবস্থায়? এর জবাব কী আছে আদৌ? এদের ও কী চলাফেরার ভঙ্গিতে সমস্যা আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী?

আচ্ছা এবার আসি আমাদের শাসনব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গিতে শুনতে দৃষ্টিকটু লাগলেও বাংলাদেশে শাসনব্যবস্থা নামে কোনো শব্দেরই অস্তিত্ব নেই। শুনতে হাস্যকর লাগলেও এটাই সত্যি।

ছবি: সংগৃহীত

আমাদের দেশে শাসনব্যবস্থা বলতে আমরা যে সার্কাস দেখতে পাই তা হলো এমন যে, একটি অবুঝ শিশু ধর্ষনের শিকার হবে, বাব- মা সন্তান হারানোর বেদনায় আহাজারি করবে, ধর্ষক বুক ফুলিয়ে হাটে বাজারে চলাফেরা করবে নয়তো তাকে ধরা হবে এবং তাও তদন্তের ব্যবস্থা করা হবে যে সে আদৌ ঐ শিশুটিকে তার হিংস্রতার চোবলে চোবল মেরেছে কিনা, তারপর মিথ্যা ফাঁসি দায়ের করা হবে ১০-১৫ দিন কারাগারে রাখা হবে তারপর সে মুক্ত। এরপর মিড়িয়ার লোকজন পারলে সারাদিনই ঐ সন্তান হারা বাব- মা এর সামনে মাইক্রোফোন নিয়ে বসে থাকবে তাদের প্রতিক্ষণে ক্ষণে মনে করাবে তার সন্তানের ঝীর্ণশীর্ণ চেহারাটি, তাদের মনে করাবে যে মা - বাবা বেচেঁ থাকাকালীন সন্তান হারানোর বেদনা যে কতোটা ভয়ংকর! এই নিমর্ম অবস্থায় এটা যে কতোটা অসুস্থ মস্তিষ্কের পরিচয় বহন করে তা নিয়ে আমাদের দেশের সাংবাদিকরা আজও অজ্ঞ। কই তাদের এই বার্তা কী বিচারব্যবস্থাকে নাড়া দিতে পেরেছে? তারা কী আজ পর্যন্ত কোনো ধর্ষকের আটকের সাথে সাথে ফাঁসি দিতে দেখেছে? কিন্তু হ্যাঁ একটা দৃশ্য অবশ্যই বাস্তবায়িত হয় তা হলো এই যে, তাদের তথ্য দেখে এই প্রেক্ষাপট দেখে আমাদের দেশের প্রশাসনকে একটু নাড়া দে এবং তারা এসে এই ধর্ষিতার পরিবারকে কিছু অনুদান দিয়ে যায়।সেখানেই তৎক্ষনাৎ সম্পূর্ণ ঘটনা, আর্তনাদ, আহাজারি ভূলুণ্ঠিত হয়। এটাই হলো বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা!

ছবি: সংগৃহীত

আমাদের প্রশাসন ব্যবস্থার একটি সহজাত সহজবোধ্য ভাষা হলে আমাদের হাতে কিছু করার নেই, আমরা আমাদের সর্বোচ্ছ দিয়ে চেষ্টা করছি । শুনতে খুবই হাস্যকর লাগে এই যে, ধর্ষককে হাতে পেয়েও আপনাদের নোটিশ জারি করার কথা ছিলো ফাঁসির আর আপনাদের থেকে নোটিশ জারি করা হয় ভালোভাবে তদন্তের। এটা খুবই উপহাস্যের বিষয়, শাসনব্যবস্থা কী এমন হয়, এমন হওয়ার কথা?

আমাদের দেশের শাসনব্যবস্থা খুবই কার্যকর এবং কঠোর হয় নিরাপদ মানুষগুলের ক্ষেএেই তখন শাসনব্যবস্থার সকল ধারা সাথে সাথেই জারি করা হয়। কিন্তু যেখানে কার্যকর আইন জারি করার জন্য এতো লিখা -লেখি, এতো মিছিল- মিটিং, এতো সংবাদ, এতো কিছু সেখানে আমাদের শাসনব্যবস্থা জারিকারী মানুষগুলো অন্ধ।

লেখক: আতকিয়া ফাহমিদা লাভনী

কেনো যখনই ধর্ষককে পাওয়া যায় যখন ধর্ষক নিজেই স্বীকারোক্তি প্রদান করে যে, সে নিজেই এই নিমর্ম কাজটির প্রবক্তা তখন এতো তদন্তের বিষয়টি কেনো আসে প্রশাসনের মাথায়? তখন কী এই ধর্ষককে খোলা ময়দানে জনসম্মুখে ফাঁসি দেওয়া যায় না? তখন কী সাথে সাথেই সন্তানের বিনিময়ে ধর্ষিতার মা- বাবাকে অনুদান প্রদান না করে ফাঁসি জারি করে এই নরপশুদের হিংস্রতা কমানো যায় না? আর কতোগুলো শিশুকে এই নিমর্মতার বলি হতে হবে প্রশাসনকে কঠোর হওয়ার জন্য?

"এই বিচারহীনতার সমাজ ব্যবস্থায় আর কতো প্রাণ গেলে সরকার এর চোখ খুলবে? " ধর্ষন, বিচারহীনতা ও রাষ্ট্রের নীরবতার বিরুদ্ধে এক বিবেকবান নাগরিকের প্রশ্ন

লিখেছেন, আতকিয়া ফাহমিদা লাভনী
শিক্ষার্থী,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার লেখা প্রকাশের জন্য boithak.office@gmail.com -এ পাঠান