শিক্ষাব্যবস্থায় তত্ত্ব ও বাস্তবের দূরত্ব
শিক্ষার মূল লক্ষ্যই হলো ব্যক্তিকে স্বাবলম্বী করে তোলা। শিক্ষার লক্ষ্য হলো সমাজকে, সমাজে বসবাসকারী মানুষদের একীভূত করে প্রগতিশীল সমাজে অভিযোজনের উপযোগী করে তোলা। শিক্ষার লক্ষ্য হলো সমাজে বিদ্যমান শ্রেণিবিভাজন দূরীভূত করে সম্পূর্ণ দেশকে, দেশের নাগরিকদের উন্নয়নে, স্বাবলম্বনের আওতায় আনয়ন।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আসলেই এই লক্ষ্য পূরণে সক্ষম? বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা আদতেও পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে অভিযোজনের সক্ষম? বাংলাদেশে শ্রেণিবিভাজন অনুপস্থিত? না।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা মোটেই লক্ষ্যগুলো পূরণের উপযোগী নয়। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে ত্রুটিপূর্ণ দিক হলো এর অনমনীয়তা। বর্তমানে বিশ্বে পঞ্চম শিল্পবিপ্লব বিদ্যমান, কিন্তু বাংলাদেশের অনমনীয় শিক্ষাব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশ এবং দেশের জনগণ, প্রশাসন এখনও মান্ধাতার যুগেই পড়ে রয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা সমাজকে একীভূতকরণের পরিবর্তে বিভক্ত করছে, যার বীভৎস রূপ প্রতিনিয়ত চোখে পড়ছে।
বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জ্ঞান শুধুই তাত্ত্বিক; বাস্তবিক জীবনে অর্জিত জ্ঞানের কোনো প্রয়োগ করা হয় না। বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের স্বল্পতার কারণে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল থাকায় ব্যবহারিক জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়ছে।
অন্যদিকে, বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ এবং উন্নয়নে সহায়ক। তবুও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এই ক্ষেত্রগুলো শুধুই জীবন নির্বাহের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত এবং সাধারণ শিক্ষার সাথে এই ক্ষেত্রগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ফলে মোটা দাগে দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত হচ্ছে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থায় নজর রাখলে দেখা যায়, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, সিঙ্গাপুর—দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থায় প্রচলিত রয়েছে ইন্টিগ্রেটেড সিস্টেম। ডুয়াল সিস্টেমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উন্নত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন করে তৈরি করার পাশাপাশি কর্মক্ষম ও স্বাবলম্বী করে তোলা হয়। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ফলপ্রসূ করতে ইন্টিগ্রেটেড এবং ডুয়াল সিস্টেম চালু করা যুক্তিযুক্ত। এছাড়াও সাধারণ শিক্ষা এবং ব্যবহারিক তথা বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা উচিত।
দেশকে পরিবর্তিত বিশ্বের সাথে অভিযোজনের জন্য প্রয়োজন নমনীয় শিক্ষাব্যবস্থা, প্রয়োজন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, প্রয়োজন সর্বজনীন বিষয়ে দক্ষ মানবসম্পদ, প্রয়োজন সঠিক মূল্যায়ন, প্রয়োজন প্রত্যাশিত পরিবর্তন।
লিখেছেন, নুরুন্নাহার খান দিগন্তী শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়