শরণার্থী শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটের এক ইতিহাস

শরণার্থী শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটের এক ইতিহাস

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের বয়স এখন প্রায় এক দশক। ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের পর মাত্র কয়েক মাসে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। কিন্তু এই সংকটের ইতিহাস ২০১৭ সালেই শুরু হয়নি, বরং এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের বৈষম্য, নাগরিকত্বহীনতা, সহিংসতা এবং অধিকার হারানোর দীর্ঘ ইতিহাস। তাই রোহিঙ্গাকে কেবল “শরণার্থী” হিসেবে দেখলে তাদের সংকটের গভীরতা বোঝা সম্ভব নয়; তাদেরকে দেখতে হবে একটি ইতিহাস, পরিচয়, সংস্কৃতি ও স্মৃতি বহনকারী জনগোষ্ঠী হিসেবে।

ছবি: সংগৃহীত

ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া

আধুনিক শরণার্থী সমস্যার সূচনা হয় মূলত বিংশ শতকের শুরুতে, যখন ইউরোপের বহু-জাতিগোষ্ঠীর সাম্রাজ্য ভেঙে গিয়ে নতুন Nation-state গঠিত হয়। নতুন জাতি রাষ্ট্রগুলোর মূলনীতি ছিল One State - One Nation - One Culture। যারা এই জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি, তাদের অনেককেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় শরণার্থীরা আন্তর্জাতিক সহায়তার দ্বারস্থ হয়। শরণার্থী সংকট মোকাবিলার জন্য প্রথমে League of Nations এবং পরে United Nations গঠিত হয়, যারা এই বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে “Refugee” নামে একটি আন্তর্জাতিক পরিচয় প্রদান করে।

রোহিঙ্গাদের ইতিহাস মিয়ানমারের রাখাইন বা ঐতিহাসিক আরাকান অঞ্চলের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই অঞ্চলে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক চর্চা বহু শতাব্দী ধরেই প্রচলিত ছিল। তবে আধুনিক সময়ে ঔপনিবেশিক শাসন, জনসংখ্যা স্থানান্তর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সহিংসতা এবং পরবর্তী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ফলে রাখাইনের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার পরও রোহিঙ্গাদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। বিশেষ করে ১৯৮২ সালের মিয়ানমার Citizenship Law তাদের বড় অংশকে কার্যত নাগরিকত্বের বাইরে ঠেলে দেয়। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা UNHCR-এর মতে, নাগরিকত্ব বহিষ্কারের এই বাস্তবতা রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্রহীনতার অন্যতম প্রধান কারণ। (UNHCR⁠)

ছবি: সংগৃহীত

এরপর কয়েক দফায় বড় আকারের বাস্তুচ্যুতি ঘটে। বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ সালে আনুমানিক ২ লাখ ৫০ হাজার এবং ১৯৯১-৯২ সালে আরও প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। ২০১৬ সালেও প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ২০১৭ সালের আগস্টের পর এই সংখ্যা এক লাফে ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি হয়।

২০১৭ সালের ঘটনাটি ছিল এই দীর্ঘ ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়। জাতিসংঘের অনুসন্ধানে উত্তর রাখাইনের অন্তত ৩৯২টি গ্রাম আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংসের তথ্য উঠে আসে এবং ৭ লাখ ২৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গার পালিয়ে যাওয়ার কথা নথিভুক্ত হয়। (United Nations Press⁠) ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কক্সবাজারে গড়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতি।

ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার তীব্র প্রচেষ্টা

একজন শরণার্থী কেবল তার বাসস্থান হারান না; হারান পরিচিত পরিবেশ, সামাজিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যত পরিকল্পনার ওপর তার নিয়ন্ত্রণ। একজন রোহিঙ্গার কাছে রাখাইনের একটি গ্রাম কেবল একটি বসতি নয়, বরং সেখানে রয়েছে তার পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য, শৈশবের স্মৃতি এবং দীর্ঘ পারিবারিক ইতিহাসের গল্প। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলো এখন শুধু মানবিক সহায়তার কেন্দ্র নয়; এখানে গড়ে উঠেছে রোহিঙ্গা সংস্কৃতির এক নতুন ভূগোল। নিজেদের ভাষা, ধর্মীয় অনুশীলন, পারিবারিক কাঠামো, লোককথা ও মৌখিক ইতিহাসের মধ্য দিয়ে তারা হারানো সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার চেষ্টা করছে। স্মৃতি এখানে শুধু অতীতের গল্প নয়; এটি হয়ে উঠেছে পরিচয় টিকিয়ে রাখার একটি সামাজিক প্রক্রিয়া। ক্যাম্পের শিশুরা এমন একটি বাস্তবতায় বেড়ে উঠছে, যেখানে তাদের জন্মস্থান বাংলাদেশ হলেও পারিবারিক স্মৃতি ও পরিচয়ের কেন্দ্র মিয়ানমারের রাখাইন।

ছবি: সংগৃহীত

রোহিঙ্গা সংকটের বহুমাত্রিক গতিপ্রকৃতি

দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি একটি সমাজকে অপরিবর্তিত রাখতে পারে না। ২০১৭ সালে যারা বাংলাদেশে এসেছিল, তাদের অনেক সন্তান এখন বাংলাদেশের ক্যাম্পেই বেড়ে উঠছে। অর্থাৎ সংকটটি ধীরে ধীরে প্রথম প্রজন্মের displacement থেকে প্রজন্মান্তরীণ displacement-এ রূপ নিচ্ছে।

২০২৬ সালের ৩০ জুনের যৌথ বাংলাদেশ সরকার–UNHCR তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট রোহিঙ্গা শরণার্থী ১২,০০,১৭১ জন। এর মধ্যে কক্সবাজারে ১১,৬৬,৩৫২ জন এবং ভাসানচরে ৩৩,৮১৯ জন অবস্থান করছে। কক্সবাজারে তারা ৩৩টি ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে বসবাস করছে। (UNHCR Data⁠) এই বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে একটি বড় অংশ শিশু ও তরুণ। ফলে দিনকে দিন সংকটের চরিত্রও পরিবর্তিত হচ্ছে। অন্যদিকে খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক সেবার জন্য রোহিঙ্গারা ব্যাপকভাবে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে বাংলাদেশের ওপরও চাপ বাড়ছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, রাখাইনে চলমান সংঘাত নতুন করে বাস্তুচ্যুতির চাপ তৈরি করছে। ফলে ২০১৭ সালের সংকটকে একটি “সমাপ্ত ঘটনা” হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি এখন একটি protracted refugee crisis—যেখানে পুরোনো শরণার্থী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নতুন করে বাস্তুচ্যুত মানুষের বাস্তবতা যুক্ত হচ্ছে।

ছবি: সংগৃহীত

সংখ্যা নয়, জীবনের গল্প

রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা আজ প্রায় ১২ লাখ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিশাল সংখ্যাটি আমাদের অনুভূতিকে অসাড় করে দিতে পারে। কারণ ১২ লাখ অর্থ আসলে ১২ লাখ মানুষের জীবনের গল্প; শৈশব, পরিবার, স্মৃতি, স্বপ্ন ও হারানোর গল্প। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান তাই শুধু ত্রাণ বিতরণ বা সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, অধিকার ও বসতভিটায় ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মানবিক মর্যাদা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি।

এই displacement মানে শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মানুষের শারীরিক স্থানান্তর নয়; এটি স্থান, পরিচয়, স্মৃতি ও সামাজিক সম্পর্কের পুনর্গঠন। তাই রোহিঙ্গাকে শুধু পরিসংখ্যানের একটি সংখ্যা হিসেবে দেখলে তাদের ইতিহাসের প্রতি অবিচার করা হয়। কারণ প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন মানুষ, একটি ইতিহাস এবং একটি অপেক্ষমান ভবিষ্যতের গল্প।

লিখেছেন, লুজাইন রব্বানী চিত্রণ ( শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় )