স্বপ্ন দেখার বয়সে অপরাধের পথে কিশোররা

স্বপ্ন দেখার বয়সে অপরাধের পথে কিশোররা

বর্তমান বাংলাদেশে কিশোর অপরাধ একটি উদ্বেগজনক সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

দেশে যত অপরাধমূলক কাজ সংগঠিত হয়, তার বেশির ভাগই আমাদের সমাজের তরুণদের দ্বারা হচ্ছে। যে তরুণদের হাত ধরে বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার কথা, আজ সেই তরুণদের হাতেই ধ্বংস হচ্ছে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই বাংলাদেশ। একসময় কিশোরদের অপরাধ সীমিত পর্যায়ে থাকলেও বর্তমানে চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, কিশোর গ্যাং, সাইবার অপরাধ, মাদক-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড, খুন এবং সহিংসতায় তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। একজন মানুষ অপরাধী হিসেবে জন্মগ্রহণ করে না; সমাজের বিভিন্ন নেতিবাচক কারণ তাকে অপরাধী করে তুলতে পারে।

ছবি: সংগৃহীত

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক অশান্তি, বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ, নৈতিক শিক্ষার অভাব, প্রযুক্তির অপব্যবহার, নেতিবাচক সামাজিক পরিবেশ ইত্যাদি কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা UNICEF-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিশু ও কিশোরদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা, নির্যাতন ও অবহেলার শিকার হয়। সংস্থাটির একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৯ জন শিশুই কোনো না কোনোভাবে শারীরিক বা মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এছাড়া ৫-১৭ বছর বয়সী প্রায় ৭ শতাংশ শিশু শিশুশ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। এসব পরিস্থিতি শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে এবং অনেক সময় তাদের অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়।

আজকাল বিভিন্ন স্কুল-কলেজের সামনে বখাটে তরুণ ছেলেরা নারীদের বিভিন্ন কুরুচিপূর্ণ কথা বলছে, অশালীন অঙ্গভঙ্গি করছে। অনেক সময় তাদের প্রস্তাবে রাজি না হলে অ্যাসিড ছোড়ার মতো নিকৃষ্ট কাজ করতেও তারা একবার ভাবছে না।

ছবি: সংগৃহীত

পরিবার হচ্ছে একটি শিশুর প্রথম ও প্রধান বিদ্যালয়। এটি শিশুর বেড়ে ওঠার নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু যখন পরিবারে কলহ, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, দীর্ঘ সময় সন্তানের প্রতি অবহেলা এবং সন্তানদের পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধানের অভাব থাকে, তখন কিশোররা মানসিকভাবে পরিবারের মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে তারা সহজেই খারাপ সঙ্গের সঙ্গে মিশে যায়। এর ফলে তারা ধীরে ধীরে মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এবং মাদকের টাকা জোগাড় করতে চুরি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে যায়। তাই পরিবারের মানুষকে, বিশেষ করে বাবা-মাকে, শিশুকাল থেকেই সন্তানদের নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি যথাযথ তত্ত্বাবধান করতে হবে, যাতে তারা খারাপ কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে না পড়ে।

বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির বিস্তার বর্তমান সময়ে অনেক বেড়ে গেছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত পুলিশ তথ্যভিত্তিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে অন্তত ২৩৭টি কিশোর গ্যাং রয়েছে, যার মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ১১৮টি সক্রিয় রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশে প্রায় ৫০ হাজার তরুণ এসব গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত এবং শুধু রাজধানীতেই ২০ হাজারের বেশি কিশোর বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত, যা আমাদের দেশের উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।

ছবি: Dhaka Tribune

প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। যেমন: সাইবার অপরাধ, হ্যাকিং, অনলাইন জুয়া, প্রতারণা এবং সহিংস কনটেন্টের প্রতি আসক্তি। অনেক সময় দেখা যায়, দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাস্তায় বড় হচ্ছে। ফলে তারা সহজেই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে। ইউনিসেফ বাংলাদেশের এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশে ৩.৪ মিলিয়নের বেশি শিশু বিভিন্ন সময়ে রাস্তায় বসবাস ও কাজ করতে বাধ্য হয়। কিশোর অপরাধের কারণে দেশে নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি বড় অংশ অপরাধজগতে হারিয়ে যাচ্ছে, যা জাতীয় উন্নয়নের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।


বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে সামাজিক অবক্ষয় সবচেয়ে বড় কারণ। সামাজিক অবক্ষয় বলতে সমাজের নৈতিকতা, মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের অবনতিকে বোঝায়। বর্তমানে কিশোরদের একটি অংশের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধের ঘাটতি দেখা যায়। তারা বড়দের শ্রদ্ধা করে না, বাবা-মায়ের কথা শোনে না এবং তাদের মধ্যে শৃঙ্খলার অভাব দেখা যায়। তারা উগ্র জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, ফলে কিশোর বয়সেই নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

কিশোর অপরাধ কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি সমগ্র দেশের জন্য একটি সমস্যা। সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক মূল্যবোধের অভাব, পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্বহীনতার কারণে কিশোর অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই একটি সুস্থ, মানবিক, সুন্দর, সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশ গড়তে আমাদের দেশের তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। তাদের নিজেদের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশকেও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তাই কিশোরদের সঠিক শিক্ষা, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই একটি উন্নত দেশ গঠন করা সম্ভব হবে।

লিখেছেন, লামিয়া ইসলাম ( শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় )