বেড়ে ওঠা যাঁদের সাথে

বেড়ে ওঠা যাঁদের সাথে

ছেলেবেলায় পড়া গল্প-উপন্যাসের কোনো চরিত্র যদি সত্যিই হতে পারতাম, আমি বোধহয় সন্তুই হতে চাইতাম। কাকাবাবুর সঙ্গী হয়ে রহস্যের নেশায় ঘুরে বেড়াতাম দেশ-দেশান্তরে। ইয়েতির সন্ধানে হিমালয় অভিযানে যেতাম, কাশ্মীরে সম্রাট কনিস্কের কাটা মুন্ডুর খোঁজে নামতাম অজগরের গুহায়। আফ্রিকার জঙ্গলে পথ হারিয়ে মাসাই'দের গ্রামে বন্দী হতাম, কিংবা আন্দামান ঘুরে হিংস্র জারোয়াদের দ্বীপে গিয়ে খুঁজে নিতাম সবুজ দ্বীপের রাজাকে।

লেখক: তানভীর হাসান

তোপসে হতে পারলেও মন্দ হতো না। লক্ষ্ণৌ ঘুরতে গিয়ে ফেলুদার সাথে আমিও নেমে পড়তাম বাদশাহী আংটির খোঁজে। রাজস্থানে উটের পিঠে সওয়ার হয়ে চলতাম সোনার কেল্লার সন্ধানে। কৈলাশে কেলেংকারি ধরতে গিয়ে অজন্তা-ইলোরাটাও দিব্যি ঘুরে আসা যেতো। কিংবা দার্জিলিং-এর ম্যাল-এ বসে মুখের আধখান পুড়িয়ে সাক্ষী হতাম ফেলুদার প্রথম গোয়েন্দাগিরির। মগনলালদের শত শয়তানি ও প্যাঁচের ভীড়েও লালমোহন বাবুর ভুবন ভোলানো হাসি মনে করিয়ে দিতো, ধুলোমাটির পৃথিবীতে সত্যিকারের বন্ধুও বড় কম নয়।

ছবি: সংগৃহীত

যদি হতে পারতাম বই পোকা রবিন মিলফোর্ড, কিশোর পাশার প্রিয় 'নথি'। রকি বীচে লোহা লক্করের জঞ্জালের নিচে পুরানো মোবাইল হোমে তিন গোয়েন্দার হেডকোয়ার্টারটাই হতো আমার গোপন আস্তানা। গোয়েন্দাগিরির সাথে সাথে কিশোর, মুসার সঙ্গী হয়ে দুঃসাহসী অভিযানে হারিয়ে যেতাম অ্যামাজানের গভীর জঙ্গলে, ভেলায় চড়ে পাড়ি দিতাম প্রশান্ত মহাসাগর। আহমদ মুসা! সে তো এক স্বপ্নের নাম, এক প্রচন্ড বিদ্রোহের নাম, ন্যায়ের মশাল হাতে মুক্তির মিছিল নিয়ে ক্লান্তিহীন ছুটে চলা এক লড়াকু বীরের নাম৷ যদি পারতাম তাঁর মতো নির্যাতিত মানবতার ত্রাতা হতে, পশ্চিম থেকে পূর্বে, এশিয়া থেকে আফ্রিকায় ভয়ংকর সব অভিযানের নেশায় ছুটে বেড়াতে! জীবন নিয়ে বোধহয় আর কোনো আক্ষেপ থাকতো না।

পটলডাঙার প্যালারাম হলেই বা ক্ষতি কী ছিল? রোগা পেট নিয়ে দিনরাত পালাজ্বরে ভুগতাম আর পটল দিয়ে খেতাম শিঙ্গি মাছের ঝোল। ক্যাবলা, হাবুলের সাথে চাটুজ্যেদের রোয়াকে বসে তেলেভাজা চিবুতে চিবুতে টেনিদার গালগল্প গুলোও নাহয় গিলতাম দুয়েক ঢোক। না গিলেই বা উপায় কী? উসখুস করলেই এক চড়ে মুন্ডু কাঠমান্ডুতে উড়ে যাবে, নাকটা গিয়ে পড়বে নাসিকে। কিংবা কে জানে, কানজোড়া হয়তো সোজা কানপুরই রওনা হয়ে যাবে। তার চেয়ে ঢের ভালো, 'ডি লা গ্র‍্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস ইয়াক ইয়াক' বলে পাড়া মাথায় তুলতাম। বাহাত্তর নম্বর বনমালী নস্কর লেনের মেস বাড়ির চিলেকোঠায় বসে বসে ঘনাদার গল্পের আসরের মুগ্ধ স্রোতা সুধীর হতে পারাটাও কি কম ভাগ্যের? হ্যাঁ হ্যাঁ, সেই ঘনাদার কথাই বলছি। এন্টার্কটিকা থেকে আন্দিজ পর্বতমালা, নিউ হেব্রাইডিজ থেকে ল্যাব্রাডর, গেলো দু'শো বছর ধরে এই পৃথিবীর হেন জায়গা নেই যেখানে তিনি যাননি, হেন ঘটনা ঘটেনি যার সঙ্গে তাঁর কোনো যোগ নেই।

ছবি: সংগৃহীত

খালেদ, রাজু আর ছোট চাচার সাথে টোপন গিয়েছিলো টি-রেক্সের সন্ধানে। সাঙ্গু নদীতে ভেসে বান্দরবানের পাহাড় ঘেরা সে গহীন অরণ্যে, পাহাড়ি দানোরা যেখানে নিরবে ঘুমিয়ে আছে লক্ষ বছর ধরে। যদি থোয়াংসা চাইয়ের মতো একটা বন্ধু জোটাতে পারতাম, সবকিছু থেকে ছুটি নিয়ে বাকি জীবনটা সেখানেই কাটিয়ে দিতাম নির্ঘাত। কিংবা যদি বলি আমার বন্ধু রাশেদের কথা, হাতকাটা রবিন বা জারুল চৌধুরীর মানিকজোড়ের কথা। এই আমিটা তখন ইবু, আমিটা টোপন কিংবা মুনীর। বাচ্চাকালে বুকের গহীনে একেকটা স্বপ্নের চরিত্র গেঁথে দিয়েছিল লোকটা।

"বুঝলি টুপুর, মানুষ নামের জীবটা বড্ড ঘড়েল"- সোফায় বসে ঠ্যাং দোলাতে দোলাতে আলগা মন্তব্যটা ছুঁড়ে দিয়েছিল পার্থ। তখনও কী জানতাম, বাংলা সাহিত্যের সবচে তুখোড় লেডি গোয়েন্দার খপ্পরে পড়ে গেছি! অবশ্য মিতিন মাসির গোয়েন্দাগিরির থেকে তাঁর ভ্রমণকাহিনীই টানতো বেশি। মাসির সঙ্গী হয়ে টুপুর, বুমবুম, পার্থ মেসোর সাথে সারাণ্ডার জঙ্গল, কোচি, কেরালা, সুন্দরবন হয়ে সুদূর সিঙ্গাপুর পর্যন্ত ঘুরে আসতাম স্রেফ বইয়ের পাতায় ভর করে।

ছবি: সংগৃহীত

এই দ্যাখো! নিউটনের কথাই তো বলতে ভুলে গেছি। ঠিক ধরেছো, প্রফেসর শঙ্কুর প্রিয় বেড়াল নিউটন। একবার যদি ও ব্যাটার ভেক ধরতে পারতাম! উশ্রীর ধার থেকে এক লাফে মঙ্গল গ্রহটাই চক্কর মেরে আসা যেতো, ব্যোমযাত্রী শঙ্কু মহাশয়ের সঙ্গী হয়ে। 'রামলালের বয়স কম ছিল, কিন্তু দুষ্টু বুদ্ধি তার কম ছিল না'। ছেলেবেলায় এই রামই তো ছিল আরেক স্বপ্নের চরিত্র। শরৎচন্দ্রের লেখনীর হাত ধরে রামলাল, নারায়ণী, কিংবা মেজদিদি হেমাঙ্গিনী, বিন্দুর ছেলে বা শ্রীকান্তের নতুনদা, পিয়ারী কত বিচিত্র কুশীলবকে যে সাথী করেছিলাম তার কি ইয়ত্তা আছে?

শেষ হয়েও তো হয় না শেষ। তাতাবাবুকে দিয়েই শেষ করি। তাতাবাবুকে চেনেন তো? সুকুমার রায়। হযবরল-র শ্রীকাক্কেশ্বর কুচকুচ থেকে নিয়ে খিচুড়ি-র হাঁসজারু সবেরই স্রষ্টা যিনি। শিবঠাকুরের আপন দেশে সব্বোনেশে আইনের ফাঁস কেটে বেরোতে চাইলে তো আর যে নন্দলালের মতো মন্দ কপালে কাজ হবে না, চাই পাগলা দাশুর মতো ক্ষেপামি বুদ্ধি। আরে এ সব তো তাঁর লেখা পড়েই জানলুম। ছোট্ট এ জীবনে হাতে গোনা যে কটি বইই পড়েছি, ছেলেবেলায় সেটার অভ্যেসটা গড়ে তুলেছিলুম এই এনাদেরই হাত ধরে। বিশ্ব বই দিবসে, স্মৃতির পাতা হাতড়ে একটু করে স্মরণ করার চেষ্টা করেছি তাঁদের সবাইকে। ছোট্টবেলার স্বপ্নের এই নায়কেরা পাঠকের হৃদয়ে বেঁচে থাকুন অনন্তকাল।

লিখেছেন, তানভীর হাসান ( শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় )

আপনার লেখা প্রকাশের জন্য boithak.office@gmail.com -এ পাঠান।