বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনালগ্ন বা মধ্যম স্তরেই শিক্ষার্থীরা কেন ঝরে পড়ে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনালগ্ন বা মধ্যম স্তরেই শিক্ষার্থীরা কেন ঝরে পড়ে?

গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কঠোর পরিশ্রম করে, অনেক সময় পর্যাপ্ত শিক্ষার পরিবেশ ছাড়াই শত শত শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় আসে। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করে তারা যখন উচ্চশিক্ষার এই নতুন জগতে প্রবেশ করে, তখন সামনে খুলে যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা। নতুন শহর, নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ। সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া তাদের জন্য সহজ হয় না। বিশেষ করে যারা পরিবার ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে প্রথমবারের মতো দূরে এসে থাকে, তাদের অনেকের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরুটা হয়ে ওঠে এক কঠিন অভিযোজনের সময়।

প্রথম বর্ষের একজন শিক্ষার্থীকে একই সঙ্গে পড়াশোনা, নতুন পরিবেশ, আবাসন, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামাজিক সম্পর্ক, সবকিছু সামলাতে হয়। অনেক শিক্ষার্থীই জানে না কোথায় গিয়ে নিজের সমস্যার কথা বলবে। নতুন পরিবেশে কাউকে আপন করে নিতে না পারা কিংবা নিজের মনের কথা প্রকাশ করতে না পারার কারণে ধীরে ধীরে তার চারপাশে তৈরি হয় একাকিত্বের দেয়াল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছরে শিক্ষার্থীদের দিশাহারা হয়ে পড়া, আর্থিক অস্বচ্ছলতা, আবাসনসংকট, বৈষম্য, যৌন হয়রানি ও র‍্যাগিংয়ের মতো বিষয় যে মানসিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে, তা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রেও আলোচনা হয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত

অর্থনৈতিক সংকটও এখানে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হলে শহরে থাকা, খাবার, যাতায়াত, বইপত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ চালানো অনেক শিক্ষার্থীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে না চেয়ে কেউ কেউ নিজের সমস্যার কথাও প্রকাশ করে না। ফলে পড়াশোনার চাপের সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় একাডেমিক চাপ। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে একজন শিক্ষার্থীকে হঠাৎ করেই নতুন ধরনের প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়। স্কুল ও কলেজে ভালো ফল করা শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যখন প্রত্যাশিত ফল করতে পারে না, তখন তার আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা লাগে। CGPA ক্রমাগত কমতে থাকলে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পরিবার ও নিজের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার হতাশা তখন তাকে আরও ভেতরে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার পেছনে শুধু অর্থনৈতিক বা একাডেমিক চাপই দায়ী নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পারিপার্শ্বিক পরিবেশও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। র‍্যাগিং, ইভটিজিং, প্রকাশ্যে অপমান, অশালীন মন্তব্য কিংবা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে হয়রানি একজন শিক্ষার্থীর আত্মসম্মান ও নিরাপত্তাবোধকে গভীরভাবে আঘাত করতে পারে।

ছবি: সংগৃহীত

র‍্যাগিংয়ের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সময়েও নবীন শিক্ষার্থীদের র‍্যাগিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও পরিচয় পর্বের নামে মানসিক হয়রানি, কোথাও গালাগাল, আবার কোথাও শারীরিকভাবে অপমানজনক আচরণের অভিযোগ এসেছে। র‍্যাগিংকে অনেক সময় ‘মজা’, ‘পরিচয় পর্ব’ কিংবা ‘সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক তৈরির অংশ’ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু অপমান, ভয় দেখানো কিংবা মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন কোনোভাবেই সুস্থ সম্পর্ক তৈরির উপায় হতে পারে না। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে সাইবার বুলিং। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, অশালীন মন্তব্য, কটূক্তি, ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে হয়রানি কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের হুমকি, এসব একজন শিক্ষার্থীর জন্য ভয়াবহ মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কোনো শিক্ষার্থী যদি মনে করে তার ব্যক্তিগত বিষয়টি পরিবার বা সমাজে প্রকাশ হয়ে যাবে, তাহলে সে ভীষণ অসহায় হয়ে পড়তে পারে।

ছবি: সংগৃহীত

সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, অনেক শিক্ষার্থী এসব সমস্যার কথা কাউকে বলতে পারে না। পরিবারের কাছে বলতে ভয় পায়, বন্ধুদের কাছে বলতে সংকোচ করে, আবার শিক্ষক বা প্রশাসনের কাছে গেলে বিষয়টি আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করে। ফলে সমস্যাটি নিজের মধ্যেই চেপে রাখে। বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে সে ক্রমেই ভেঙে পড়তে পারে। এখানেই তৈরি হয় একাকিত্বের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ। একজন শিক্ষার্থী পরিবার ও প্রিয়জনদের কাছ থেকে অনেক দূরে এসে যখন নিজের সমস্যাগুলো একা সামলাতে থাকে, তখন হতাশা ও দুশ্চিন্তা ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করতে পারে। পড়াশোনার চাপ, পরিবারের প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, সবকিছু একসঙ্গে যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন কেউ কেউ চরম হতাশার দিকে চলে যেতে পারে।

এই জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বও কম নয়। শিক্ষার্থীর শুধু ক্লাস নেওয়া বা পরীক্ষা নেওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ নয়। তার নিরাপদ ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করাও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। অথচ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেই। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনালগ্নেই শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি। প্রয়োজন সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ, আস্থাভাজন বন্ধুত্ব, সহযোগিতার হাত এবং সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো বিশ্বস্ত মানুষ। এমন শিক্ষক ও সহপাঠী প্রয়োজন, যাদের কাছে একজন শিক্ষার্থী ভয় বা সংকোচ ছাড়াই নিজের সমস্যার কথা বলতে পারে। প্রয়োজন কার্যকর কাউন্সেলিং সেবা, র‍্যাগিংবিরোধী কঠোর ব্যবস্থা, যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে নিরাপদ অভিযোগব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সহজলভ্য সহায়তা। শুধু নিয়ম তৈরি করলেই হবে না, সেই নিয়ম বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যখন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে, তখন সে শুধু একটি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে না। সে প্রবেশ করে সম্পূর্ণ নতুন একটি সামাজিক জগতে। সেখানে তাকে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন নিরাপত্তা, গ্রহণযোগ্যতা ও মানসিক সমর্থন। সে যদি এই তিনটি না পায়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নই কখনো কখনো তার কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠতে পারে।

ছবি: সংগৃহীত

তাই শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়াকে শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয়, সমাজ এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব। একটি শিক্ষার্থী যখন বিপদের মুখে পড়ে, তখন তাকে দোষারোপ করার আগে জানতে হবে, কেন সে একা হয়ে গেল, কেন সে সাহায্য চাইতে পারল না, কেন তার চারপাশের পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে পারছে না, ইত্যাদি বিষয় গুলো প্রথমে পরিচর্চা করা একান্তই প্রয়োজন। আর এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় এ পড়াশোনার নামের আড়ালে থাকা শিক্ষার্থী ঝরে পড়া, আত্মহত্যার কবলে ঝুঁকে পড়ার মতো অভিশাপমোচন করা সম্ভবপর হয়ে উঠবে। দেশের মেধা সম্পদ রক্ষা পাবে।

আতকিয়া ফাহমিদা লাভনী
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট

আপনার লেখা প্রকাশের জন্য boithak.office@gmail.com -এ পাঠান