দেশভাগের দুই পিঠ: উত্তরণ ও স্থায়ী প্রান্তিকতা
দুই তরুণীর কথার মর্মার্থ একই, “কেমন লাগবে! নিশ্চয়ই ভালো লাগে না।” উভয়ই দেশভাগের নির্মম পরিণতির ভুক্তভোগী। একজন বাঙালি হিন্দু, আরেকজন বিহারী মুসলমান। প্রায় বিশ মিলিয়ন হিন্দু-মুসলিম শরণার্থীর মতো উভয়ের স্থান হয়েছে শরণার্থী শিবিরে। একজন ঢাকার জেনেভা ক্যাম্পে। অন্যজন রানাঘাটের সাবেক কুপার্স ক্যাম্পের আশেপাশে। তারা দেশভাগ দেখেনি। তবে দেশভাগের ভুক্তভোগী। তারা রিফিউজি প্রজন্মের প্রতিনিধি। তাদের অনেককেই অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি বিসর্জন দিতে হয়েছে। উর্দুভাষী বিহারীকে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে জোর করে বাঙালি হতে হয়েছে এবং হচ্ছে। বাংলাভাষী বাঙালিকে বিহার-মধ্যপ্রদেশ-উত্তরাখন্ডে গিয়ে নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিতে হয়েছে এবং হচ্ছে।
দুটি সম্প্রদায়কে জিন্নাহ দুটি জাতি দাবি করে একটি অস্বাভাবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। বাঙালি মুসলমান ইউটোপিয়ার স্বপ্ন দেখেছে। সে স্বপ্ন অচিরেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। দেশভাগের ইতিবাচক প্রভাবও আছে। প্রান্তিক বাঙালি মুসলমান তার অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে পরিণত হয়েছে। তবে দেশভাগের ক্ষত অতীব ভয়াবহ। জমি-জমা, শিক্ষা, চাকুরি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে একটি স্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী ভূরাজনৈতিক সংকট উপমহাদেশের বুকে চেপে বসেছে। সীমিত সংকট, যার সমাধান অন্যভাবেও করা যেত, দেশভাগ সেটাকে বিস্তৃত এবং স্থায়ী রুপ দিয়েছে।

পার্টিশন অবশ্যম্ভাবী হয়ে গেলে লক্ষ লক্ষ লোক কচুকাটা হলো, প্রায় বিশ মিলিয়ন লোক বাস্তুচ্যুত হলো। সেই বাস্তুচ্যুতির বেদনা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এখনো বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এ বেদনা হয়তো যারা লাভবান হয়েছে, তাদের অনুধাবনও কঠিন। যে লোকটা পূর্ববঙ্গে মধ্যবিত্ত হিসেবে সম্মান নিয়ে খেয়ে-পরে বেঁচে ছিল, সে লোকটাকেই পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে একপ্লেট খিচুড়ির জন্য রিফিউজি ক্যাম্পে লাইন ধরতে হলো। লক্ষ লক্ষ রিফিউজির জীবনে বাকি ঘটনাগুলোও প্রায় এমনই হলো। পশ্চিম পাঞ্জাব থেকে যারা পূর্ব পাঞ্জাবে গেলো এবং পূর্ব পাঞ্জাব এবং অন্যান্য অঞ্চল থেকে যারা পশ্চিম পাঞ্জাবে গেলো, তাদের চেয়ে যারা পূর্ব বাংলায় এসেছে এবং পূর্ব বাংলা ত্যাগ করেছে, তাদের জীবনে দেশভাগের প্রভাব তুলনামূলক দীর্ঘস্থায়ী।

দুনিয়ার ইতিহাসে সর্ববৃহৎ মাস মাইগ্রেশন হয়েছে দেশভাগের কারণে। বাংলায় পাঞ্জাবের মতো একযোগে হয়নি, হয়েছে ধীরগতিতে। পশ্চিমবঙ্গ, বিহারসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় বিশ লক্ষ মুসলমান পূর্ববঙ্গে এসেছে, আর ৭১ সালের আগ পর্যন্ত প্রায় ষাট লক্ষ অমুসলিম পূর্ব বাংলা ত্যাগ করেছে। পূর্ববঙ্গত্যাগী রিফিউজিরা পশ্চিমবঙ্গ, বিহারসহ বিভিন্ন এলাকায় স্থান পেয়েছে। তবে দলিত সম্প্রদায় বর্ণবাদী নীতির শিকার হয়েছে। তাদের স্থান হয়েছে দন্ডকারণ্যের ভয়ঙ্কর জঙ্গলের অনুর্বর ভূমিতে এবং আন্দামানে। যারা রিফিউজি হয়েছে, তাদের অধিকাংশই হয়তো অর্থনৈতিক-সামাজিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছে। তবে পূর্ব বাংলার যে রিফিউজিরা পশ্চিমবঙ্গে স্থান না পেয়ে বিহার, ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশ, দন্ডকারণ্য, আন্দামান এমনকি আসামে স্থায়ী হয়েছে, তাদেরকে বাড়তি সাংস্কৃতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে নিজেদের ভিন্ন সমাজে মিশিয়ে নিতে হয়েছে। যারা নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিতে পারেনি, তারা সে সমাজে কোণঠাসা হয়েছে।

পূর্ববঙ্গের উর্দুভাষী বিহারীরা সেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জ্বলজ্বলে দৃষ্টান্ত, উপমহাদেশের অন্যান্য রিফিউজিদের চেয়ে যাদের আমরা খুব কাছ থেকে দেখতে পাই। দেশভাগের নির্মমতম বলি হয়েছে এই বিহারীরা, যে বেদনা তাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। প্রায় শতাব্দীর পূর্ণকালেও তাদের রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের যে বাঙালি মুসলমানেরা পূর্ববঙ্গে এসেছেন, তারা এই সমাজ-সংস্কৃতিতে মিশে যেতে পেরেছেন অনায়াসে। কিন্তু বিহার এবং অন্যান্য অঞ্চলে কচুকাটা হয়ে পূর্ববঙ্গে আসা অবাঙালি উর্দুভাষী মুসলমানেরা চিরদুঃখী। ক্ষণিক সময়ের মধ্যে তারা পাকিস্তান সরকারের আনুকূল্যে পূর্ববঙ্গে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে রুপান্তরিত হয়। পাকিস্তান সরকারের প্রতি আনুগত্য এবং উর্দুভাষী হওয়ায় তারা বাঙালিদের চেয়ে এককাঠি বেশি সুবিধা পায়। তবে একাত্তরে পাকিস্তানি আর্মির সহযোগী হিসেবে গণহত্যায় শরিক হয় এবং স্বাধীনতার আগে-পরে নিজেরাও ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়, চাকুরি-সম্পত্তিচ্যুত হয়, নাগরিকত্ব হারায়, বাসঅযোগ্য রিফিউজি ক্যাম্পে ঠাঁয় হয়। এরা পাকিস্তানে ফিরে যেতে চাইলেও পাকিস্তান সামান্য অংশকে ফেরত নেয়, বাকিরা প্রত্যাখ্যাত হয়। নাগরিকত্ব হারানোর ফলে, এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী রাতারাতি প্রান্তিক শ্রেণীতে রুপান্তরিত হয়। একসময় কর্পোরেট জবে থাকা লোকটিকে হয়তো মাটি কাটতে হয়, নয়তো রিকশা চালাতে হয়। শুরুতেই বাঙালি সমাজে মিশে যেতে পারলে হয়তো তাদের এই দুর্দশার মুখোমুখি হতে হতো না।
দেশভাগে কেউ কেউ উপকৃত হয়েছেন, তবে উপমহাদেশের লাখো হিন্দু-মুসলিম সরাসরি এই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
লিখেছেন, সাব্বির আহমেদ সোহান ( শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় )