জুলাই ডায়েরিজ: গণঅর্থায়নের এক চলচ্চিত্রযাত্রা
লিখন দত্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার অভিজ্ঞতা, আন্দোলনের ভেতরের মানুষগুলোর স্মৃতি এবং সেই সময়ের আবেগ ও বাস্তবতাকে নথিবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে তিনি নির্মাণ করেছেন ‘জুলাই ডায়েরিজ’ নামে একটি ডকুমেন্টারি। তরুণ প্রজন্মের একজন প্রত্যক্ষদর্শী ও নির্মাতা হিসেবে জুলাইকে কীভাবে দেখেছেন, কেন সেটিকে নথিবদ্ধ করার প্রয়োজন মনে করেছেন এবং সেই সময়ের স্মৃতি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কীভাবে পৌঁছানো উচিত এসব বিষয় নিয়ে বৈঠকের সঙ্গে কথা বলেছেন লিখন দত্ত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নাজমুল হুদা।
বৈঠক - জুলাই অভ্যুত্থানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেকেই লিখেছেন, কথা বলেছেন। আপনি কেন মনে করলেন, এই সময়কে নিয়ে ‘জুলাই ডায়েরিজ’ নির্মাণ করা জরুরি?
লিখন- প্রথমত, স্মৃতি সংরক্ষণের তাগিদ। ডকুমেন্টেশন আগামী দিনের রাজনীতির জন্য বড় হাতিয়ার হতে চলেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পুরোনো দিনের বহু রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ নাই হয়ে গেছে। অপরদিকে নতুন দিনের রাজনীতিটা এখনো অস্পষ্ট। আগামী দিনে বাংলাদেশপন্থী একটি সুস্থ রাজনৈতিক ধারা গড়ে তুলতে আমাদের সকলেরই দায় আছে। জুলাইয়ের ওপর বই-পুস্তক রচনা কিংবা ডকুমেন্টারি নির্মাণ সেই কাজেরই অংশ।
বৈঠক - ‘জুলাই ডায়েরিজ’-এর পেছনের মূল অনুপ্রেরণা কী ছিল?
লিখন- সাধারণ মানুষের অভিনব শক্তি। ২০২১ সালে নূরুল কবীর 'Deposing of a Dictator' নামে একটা বই করেন। তার বিষয়বস্তু ছিল ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার আইয়ুবের পতন। বইটার শুরুই হচ্ছে এই শিরোনাম দিয়ে - 'Restoring Confidence in Public Resistance'। অর্থাৎ এই কাজের মাধ্যমে নূরুল কবীর যেন বার্তা দিতে চেয়েছেন, একমাত্র জনপ্রতিরোধই পারে ভীষণ স্বৈরাচারি ও দমনমূলক একটি সরকার ব্যবস্থাকে সমূলে উৎখাত করতে। আমরা দেখব যে চব্বিশের অভ্যুত্থান সফল হবার পেছনের কারিগর এই জনগণ। ৫ই আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর ইতিহাস পাঠের এই গুরুত্ব আলাদা করে বুঝতে পারি। ডকুমেন্টারি নির্মাণ সেই ধারায় ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংগ্রামের জন্য একপ্রকার রসদ সঞ্চয়ের প্রচেষ্টা বলতে পারেন।

বৈঠক - আপনারা বলেছেন, এটি কোনো ‘মাস্টার ন্যারেটিভ’ নয়; বরং সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে জুলাইকে দেখার চেষ্টা। এই দৃষ্টিভঙ্গি কেন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে?
লিখন - মাস্টার ন্যারেটিভের কথা সম্ভবত বলিনি, বলেছি এটা কোনো ডমিন্যান্ট ন্যারেটিভ নয়। অভ্যুত্থানের বহু অংশীদার, সকলের ন্যারেটিভ এক হবে তা অবাস্তব চিন্তা। আমাদের এই কাজটা যেহেতু গণঅর্থায়নে করা, আর স্বাধীন চলচ্চিত্র, মূলধারার বাইরের, সেক্ষেত্রে আমরা একটা অল্টারনেটিভ ন্যারেটিভ নির্মাণের দিকেই আগ্রহী হয়েছি।"সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ" কথাটাকে সম্ভবত ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। আমরা জুলাইয়ের ধারাবিবরণীটা এমনভাবে তৈরি করেছি যে একজন সাধারণ নাগরিক, যার সাথে কিনা কোটার কোনো সম্পর্ক নেই, যে যে ঘটনাগুলো তাকে উদ্দীপিত করেছিল, তাড়িত করেছিল, একটা ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহের পর বাধ্য করেছিল রাস্তায় নেমে আসতে, সেগুলোকে ধরেই আমরা আমাদের বয়ানটা নির্মাণ করেছি।
বৈঠক - ছবিটি নির্মাণের জন্য গণঅর্থায়নের পথ বেছে নিয়েছেন। কেন এই সিদ্ধান্ত? মানুষের কাছ থেকে কেমন সাড়া পেয়েছেন?
লিখন - সাড়া পেয়েছি। টাকা উঠেছে অল্পই। তবে শুধু টাকা দিয়ে তো ছবি হয় না, টেকনিক্যাল সাহায্য লাগে। তাছাড়া যাতায়াত, আবাসন একটা বড় বিষয়। এই সবকিছু নিয়েই সাহায্য পেয়েছি। আমরা যারা কাজ করেছি কোনো পারিশ্রমিক নেইনি, তাই এত অল্পতে ছবি করা সম্ভব হয়েছে। যেকোনো চলচ্চিত্রেই অর্থ লগ্নিকারীর ছবিতে হস্তক্ষেপের একটা প্রশ্ন থাকে। আমাদের ক্ষেত্রে এটা আরো বেশি ছিল যেহেতু রাজনৈতিক ছবি। তাই ঠিক করেছিলাম গণঅর্থায়নে করব, যাতে সর্বোচ্চ শৈল্পিক স্বাধীনতা পেতে পারি কাজ করার ক্ষেত্রে।
বৈঠক - বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জুলাই নিয়ে একটি ডকুফিল্ম নির্মাণ করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় বাধা বা চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
লিখন - সংগঠিত হওয়া। জুলাইয়ের ছবি গণঅর্থায়নে করা ও তার জন্য ম্যাগাজিন বের করা, সবখানে ঘুরে বেড়ানো, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী উদ্যোগ গ্রহণের কোনো প্রয়োজন ছিল না। এটি করা ছিল মূলত সারাদেশে আমাদের মত তরুণ তরুণীদের সাথে পরিচিত হওয়ার, সংযুক্ত হওয়ার একটি প্রয়াস। ৫ই আগস্টের বিজয় দেশের মানুষের মধ্যে দেশকে নতুনভাবে ধারণের যে চেতনা সঞ্চার করেছিল, সেটা তরুণদের আরো বেশি প্রগতিশীল করে তুলেছে বলে মনে করি। আমার নিজের মধ্যে অন্তত এটা একটা বড় পরিবর্তন এনেছে।কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ নিলে অত ঝক্কি পোহাতে হতো না, ছবিও হয়ত আরো অনেক আগে শেষ হতো। তবে সংগঠিত যাত্রার এই জায়গাটুকু অনুপস্থিত থেকে যেত। এখন এই ছবির কথা যে অনেকেই জানেন, বহু তরুণ তরুণী নামমাত্র অর্থে হলেও এই ছবির নির্মাণ যাত্রায় অংশীদার ছিলেন, এটাকে শক্তির বড় জায়গা মনে করি।নির্মাণের পর স্বাধীন একটি চলচ্চিত্র যে এত জায়গায় প্রদর্শনী করিয়ে বেড়াতে পারছি, তার একটা বড় কারণ কিন্তু সেই সংগঠিত যাত্রা। ক্রাউডফান্ডিং এর সময় যাদের কানে এই ছবির কথা পৌঁছেছিল, তারা যখন জানতে পারছেন এই ছবি শেষ হয়েছে, নিজ থেকে আগ্রহ প্রকাশ করছেন প্রদর্শনীর ব্যাপারে।

বৈঠক - আপনার বিভিন্ন লেখায় ও পোস্টে দেখা যায়, আপনি জুলাইয়ের ‘চেতনা’ ও ‘আকাঙ্ক্ষা’কে ধরে রাখার কথা বলেন। আপনার মতে, সেই চেতনা ধরে রাখার ক্ষেত্রে একটি ডকুফিল্ম কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে?
লিখন - খুবই সামান্য। আমরা বলেছি এই ছবি জুলাইয়ের বড় দেয়ালে একটা ইঁটের গাঁথুনিমাত্র। প্রদর্শনীর পর একটা ভালো জিনিস লক্ষ্য করছি যে এই ছবির সমালোচনার মধ্য দিয়ে আরো কোন কোন জায়গায় কাজ করার সুযোগ আছে সেটা পরিষ্কার হয়ে ধরা দিচ্ছে। পাল্টাপাল্টি আরো বহু ছবি হতে হবে। "একটি ডকুফিল্ম" দিয়ে সামষ্টিকভাবে খুব বেশি কিছু পাওয়া যাবে না। তবে যে জেনারেশন এই অভ্যুত্থানে অগ্রগামী ভূমিকা রেখেছিল, অর্থাৎ জেন-জি, তাদের দিক থেকে যদি এটাকে প্রথম কোনো গোছানো ও বড় কাজ ধরি, সেক্ষেত্রে এই ছবির সার্থকতা এই যে এটা একটা সফল শুরুয়াত।
বৈঠক - অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে আমাদের সময় দেয়ার জন্য।
লিখন - বৈঠককেও অনেক অনেক ধন্যবাদ।