জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশ: শিক্ষার্থীদের ত্যাগ ও প্রাপ্তি

জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশ: শিক্ষার্থীদের ত্যাগ ও প্রাপ্তি

রাষ্ট্রচিন্তা- চবি আয়োজিত 'জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশ: শিক্ষার্থীদের ত্যাগ ও প্রাপ্তি' সেমিনারে নিবন্ধটি উপস্থাপন করেন এস. বি. ফররুখ হোসেন (রিফু)

আধুনিক স্মৃতিতে জুলাই সম্ভবত ভাঙ্গা কিংবা গড়ার মাস! পৃথিবীর যে ক্ষণকালীন ইতিহাস, তাতে এই মাসটির একত্রিশ দিনের ব্যাপ্তি আজ নাগাদ অনেকগুলো যুগান্তকারী পরিবর্তনের সাক্ষী। যদি পেছনে ফিরে তাকাই তাহলে দেখতে পাব যে, এই মাসেই ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতার দাবি জানায় ১৩ টি আমেরিকান কলোনি। বাস্তিল দুর্গ আক্রমণের ভেতর দিয়ে সূচনা ঘটে ফরাসি বিপ্লবের! জুলাইয়ের কোনও এক দিনেই শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভিক কুশীলবদের দ্বন্দ্ব, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও সার্বিয়ার যুদ্ধ।

লেখক এস. বি. ফররুখ হোসেন (রিফু) 

 সাতচল্লিশ সালের জুলাই মাসে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাশ হওয়া Indian Independence Act 1947-এর ওপর ভিত্তি করেই একই বছরের আগস্ট মাসে দক্ষিণ এশিয়ায় আত্মপ্রকাশ করে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র- পাকিস্তান ও ভারত। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই একই বছরের জুলাইতে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের “পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত উর্দু“ প্রস্তাবটির বিরোধিতা করে ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় প্রবন্ধ রচনা করে ভাষা আন্দোলনের প্রথম বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেন ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। 

 অবিভক্ত পাকিস্তানে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কিত ছয়দফা ও এগারো দফা দাবিতে আন্দোলন এবং সত্তরের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানিদের রাজনৈতিক বিজয়ের অন্যতম হেতু, ইয়াহইয়া সরকারকর্তৃক পশ্চিম পাকিস্তানের ‘ওয়ান ইউনিট’ কাঠামো বাতিল, -দুটোই সংঘটিত হয়েছিল ইংরেজি বর্ষপঞ্জিকার সাত নম্বর মাস, জুলাইতে। 

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তহবিল সংগ্রহে ও জনমত গঠনে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ফুটবল টিম গঠিত হয় জুলাই মাসে। একাত্তর সালের জুলাইতেই বাংলাদেশকে ভাগ করা হয় এগারোটি সামরিক সেক্টরে, গঠিত হয় প্রথম নিয়মিত সশস্ত্র বিগ্রেড- জেড ফোর্স। যুদ্ধ চলাকালে একই মাসের শেষভাগে লন্ডনের হাউস অব কমন্সে সংবাদ-সম্মেলনের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের ৮টি ডাকটিকিট আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়। সংগীত শিল্পী জর্জ হ্যারিসন প্রকাশ করেন তার বিখ্যাত ‘বাংলা দেশ’ গান, গেরিলা আক্রমণে ক্র্যাক প্লাটুন গুড়িয়ে দেয় ঢাকায় অবস্থিত দুটি পাওয়ারপ্ল্যান্ট। তারপর, নব্বইয়ে দশকের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ঐক্যও তৈরি হতে শুরু করে কোনও এক জুলাই মাস থেকেই।  ভীষণ এক ঘটনাবহুল মাস বটে জুলাই!  তবে, একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের এবং সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসেও জুলাইয়ের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, চব্বিশের জুলাইয়ে বাংলাদেশে সংঘটিত ছাত্র-জনতার আন্দোলন। কোটাবিরোধী আন্দোলন থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্লাটফর্ম ছাড়িয়ে যেটি ক্রমশ পরিণত হয়েছিল একটি জনগণঅভ্যুত্থানে। বিদায় নিয়েছিল স্বৈরাচারী শাসক, পৃথিবীর তাবৎ জীবিত স্বৈরাচারীর মতই দেশ থেকে পালিয়েছিল সে ।

জুলাইয়ে বাংলাদেশের মানুষ বিজয়ী হয়৷ বিজয়ী হয় ছাত্ররা। বিজয়ী হয় শ্রমিকসহ সকল পেশার মানুষ; অতি অবশ্যই স্বৈরাচারী বর্গ ব্যতিরেকে। বলা বাহুল্য, প্রাপ্ত এই বিজয়ের মূল্য ছিল অত্যন্ত চড়া। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৪০০-এরও বেশি মানুষ জুলাইয়ে খুন হন, ১১৭০০ জনেরও বেশি মানুষ গ্রেফতার ও আটক হন। খুন হওয়া মানুষদের ভেতরে ১২-১৩ শতাংশ ছিল শিশু। নারীরা আক্রান্ত হন, খুন এবং ধর্ষিত হওয়ার হুমকি পান। জুলাইয়ে আহতের সংখ্যা বাংলাদেশ সরকারের গেজেট অনুযায়ী ১৩ হাজার অতিক্রম করেছে। কিন্তু সংখ্যাভিত্তিক হিসাবের বাইরেও জুলাই পেরিয়ে আসা ভয়াল দিনের স্মৃতিতে বহু মানুষ মানসিক ও শারীরিকভাবে অবসাদগ্রস্ততার শিকার হয়েছেন বলে ধারণা করা যায়। বহু মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। বহু মানুষ হারিয়েছেন নিজেদের প্রাণপ্রিয় অবলম্বন।

এক রক্তবিমূঢ় পথ পেরিয়েই জুলাইয়ের আরাধ্য জয় পেয়েছে এদেশের জনতা। ফলত রাষ্ট্রীয়ভাবে নিজেদের সক্ষমতার ভেতরে থেকে বাংলাদেশ তার জুলাইয়ের শহীদদের মূল্যায়িত করতে চেয়েছে, যদিও  তা অকিঞ্চিৎকর কিন্তু মানুষের প্রকৃত মুক্তি আর বৈষম্যের অবসান সেই খামতি কিছুটা পূরণ করবে বলে আশা উঠেছিল দেশজুড়ে। কিন্তু, বিজয়ের পরেপরেই ক্রমশ রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করতে থাকা বর্গকে বহু বিষয়ের পাশাপাশি একটি নতুন মৌলিক সমস্যার সম্মুখে পড়তে হয়; মূলত ছাত্ররাই যে বর্গের বৃহদাংশ। জুলাইকে ঘিরে সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং পরবর্তীকালে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত অংশীজনদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে পার্থক্য তৈরি হওয়ায় 'জুলাইয়ের পরিচয়' নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। ফলত, বিপ্লব, গণঅভ্যুত্থান না কি সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন জুলাই, অচিরেই এই দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে দেখা যায় চব্বিশের জুলাইয়ের ভেতর দিয়ে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হওয়া অংশীজনদের। এবং, ঠিক এভাবেই শত শত তাজা প্রাণের বিনিময়ে প্রাপ্ত জয় ও জুলাইয়ের ছত্রিশটি দিন পরিচয়ের সংকটে পর্যদুস্ত হতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ক্রমে ক্রমে জুলাইয়ের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে বিতর্ক সর্বমহলে ক্রমশ জায়গা করে নিতে শুরু করে।

 জুলাই পরবর্তী সময়ের এই জিজ্ঞাসা যে জুলাইকে কেন্দ্র করে জুলাই পরবর্তীকালে সৃষ্ট অপ্রাপ্তিবোধ থেকেই উৎসারিত, তা দাবি করা বোধহয় ভুল হবে না। দুই হাজার চব্বিশ সালের জুলাই মাসে যখন আন্দোলনটি সংঘটিত হচ্ছে এবং প্রতিদিনের ঘটনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অভিযোজিত হচ্ছে, তখন কোনও একটি পর্যায়েও কি কোটা-ব্যবস্থার সংস্কার, স্বৈরাচারি শাসকের শাসনকালের অবসান এবং জুলাইয়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিপরীতে ন্যায় বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা ব্যতীত অন্য কোনও আকাঙ্ক্ষা জুলাইয়ের অংশীজনরা স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছিলেন? উপলব্ধ দাবিপত্র, নির্দেশনা, প্রকাশ্য ঘোষণা ও কর্মসূচি পর্যালোচনা করলে এমন কোনো আকাঙ্ক্ষার সুস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না।

জুলাইশহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদন

আন্দোলনকালীন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জন্য নাহিদ ইসলামের দশটি দিকনির্দেশনা, পরবর্তিতে আব্দুল কাদেরদের মাধ্যমে নয় দফা দাবি কিংবা সার্জিস আলমদের আট দফা দাবিসহ, সর্বশেষ জরুরি চার দফা দাবি ও এক দফা দাবি, কোথাও রাষ্ট্রের কোনও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা উল্লেখিত হয়নি। আগস্টের পাঁচ তারিখ ঢাকামুখী জনতার যে ঢল সেই ঢলের পেছনের মনস্তত্ত্ব ছিল তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামীলীগকে ক্ষমতাচ্যুত করা৷ জুলাই সে বিবেচনায় সাফল্য পেয়েছে। অর্থাৎ, প্রাথমিকভাবে ঘোষিত লক্ষ্যসমূহের বিচারে জুলাইকে মোটাদাগে সফল বলা যেতে পারে।

কিন্তু তাহলে জুলাই ব্যর্থ না সফল, এই দ্বন্দ্ব কেন জুলাইয়ের অংশীজনদের মনে হাজির হলো? এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের আগে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এই লেখাটি জুলাইয়ের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় না; বরং জুলাইকে মূল্যায়নের একটি বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো প্রস্তাব করাই এর লক্ষ্য। সেই উদ্দেশ্যে প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে, বৈপ্লবিক পরিবর্তন বলতে আসলে কী বোঝায়। বৈপ্লবিক পরিবর্তন বলতে কোনো ব্যবস্থা, প্রক্রিয়া বা ধারণায় আকস্মিক, গভীর ও আমূল রূপান্তরকে বোঝায় যা ধীরে ধীরে বিবর্তনের পরিবর্তে নাটকীয়ভাবে সবকিছুকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দেয়। এটি সমাজ, প্রযুক্তি, রাজনীতি বা অর্থনীতি, যেকোনো ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে এবং এর প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। তৎকালীন স্বৈরতান্ত্রিক বাস্তবতায় স্রেফ জুলাইয়ের ৩৬ দিনে নেতৃস্থানীয় অংশীজনদের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না নিয়ে, আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি দিয়ে এধরনের কোনও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করা সম্ভব ছিল না। ফলে আন্দোলনটি স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হলেও রাষ্ট্রের আমূল রূপান্তরের প্রকল্পে রূপ নিতে পারেনি। চব্বিশের জুলাইতে প্রস্তুতিকাল পর্যাপ্ত না হওয়ায় কিংবা প্রস্তুতির ব্যাপারটি মোটাদাগে অস্তিত্বহীন হওয়ার পরেও বাংলাদেশের মানুষ সেই সময়ে বিদ্যমান স্বৈরাচারি শাসন ব্যবস্থার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে আগস্ট মাসের জনগণঅভ্যুত্থান সংগঠিত করে। অর্থাৎ, সমাজে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় একটি স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয় কিন্তু পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবে নেতৃস্থানীয় অংশীজনরা সেটিকে বৈপ্লবিক পরিবর্তনে রূপান্তরিত করতে অপারগ হন। ফলে, আনুষ্ঠানিকভাবে স্বৈরাচারি অবকাঠামো পরিবর্তনের আপাত অক্ষম বিশাল বিপুল অভ্যুত্থানটি অনেকের হাতেই চিত্রায়িত হতে শুরু করে কেবল স্বৈরাচার উৎখাতের নিমিত্ত হিসেবে।

একথা সত্য, অভ্যুত্থানের পর নেতৃস্থানীয় অংশীজনরা জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক অর্থ সম্প্রসারণের চেষ্টা করেন। এর ফলে আন্দোলনকে কেবল স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের সূচনা হিসেবেও ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা দেখা দেয়। কিন্তু, সমাজে বসবাসরত মানুষের ভেতর কোনও নির্দিষ্ট বিষয়কেন্দ্রিক অসন্তোষ আর চরম পর্যায়ে না থাকায় এই চর্চায় সমাজে বিদ্যমান সকল বর্গের পূর্বের ন্যায় অংশগ্রহণের তাগিদ ততদিনে ফুরিয়ে এসেছে। ফলে, জুলাই পরবর্তী বাস্তবতায় বিদ্যমান সহজাত ঐক্যহীনতায় একাংশ হতাশাগ্রস্ত হতে শুরু করে। এবং জুলাইকে ব্যর্থ কিংবা আংশিক ব্যর্থ হিসেবে চিত্রিত করা আরম্ভ করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও এই বাস্তবতার ঊর্ধে নন। বরং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করায় ছাত্রদের আকাঙ্ক্ষার পারদ আরও উঁচুতে ওঠে। জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে তারা মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা করে। কিন্তু জুলাই চলাকালীন শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের ভেতরে গড়ে ওঠা 'ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা উচিত' -এই ঐকমত্য জুলাই পরবর্তীকালে ভেঙ্গে গিয়ে 'লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র-রাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিত'-এ পরিণত হওয়ায়, এবং পরবর্তীকালে জুলাইয়ের নেতৃস্থানীয় অংশীজনদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে সেই ঐকমত্যও ভেঙ্গে যাওয়ায় পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে বিভিন্ন বর্গের ভেতরে বিদ্যমান ক্ষমতার অসমতা পুরোপুরি দূর না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা আবারও নিজেদের ক্ষমতাহীন বলে অনুভব করতে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে জুলাই পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট উন্নত মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা দ্রুতই ম্লান হয়ে আসে। এছাড়া, চাকরির বাজারে জুলাই পরবর্তী বিদ্যমান কোটাব্যবস্থায় কোটার অসম ও অন্যায্য বন্টন সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের আরও বঞ্চিত করে তাদের পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে উচ্চতর সামাজিক, অর্থনৈতিক বা পেশাগত অবস্থানে উন্নীত হওয়ার পথ অর্থাৎ সামাজিক ঊর্ধ্বগামী গতিশীলতা (Social upward mobility) সংকীর্ণ করেছে। 

 সুতরাং, জুলাইয়ের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা, বিশেষত শিক্ষার্থীদের ত্যাগ ও জুলাই-পরবর্তী প্রাপ্তির নিরিখে জুলাইয়ের সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ধারণের পূর্বে আমাদের জানতে হবে, আমরা কোন জুলাইকে বিচার করছি। আমরা কি চব্বিশের আন্দোলনকালীন জুলাইকে বিচার করতে চাইছি, না কি জুলাই পরবর্তী সময়ে জুলাইকে ঘিরে নির্মিত বিস্তৃত রাজনৈতিক ও সামাজিক আকাঙ্ক্ষা সম্বলিত জুলাইকে বিচার করতে চাইছি?  যদি প্রথমটি হয়, তবে ঘোষিত লক্ষ্যসমূহের বিচারে জুলাইকে সফল বলা যেতে পারে। কারণ, এক্ষেত্রে প্রাপ্তি হিসেবে সমাজ, রাজনীতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে আমরা পেয়েছি অনেকগুলো অনানুষ্ঠানিক ইতিবাচক পরিবর্তন।  আর যদি দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে রাজনৈতিক ও সামাজিক আকাঙ্ক্ষার সবকিছু এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে, জুলাইকে ব্যর্থ বলা যেমন অতিসরলীকরণ হবে, তেমনি তাকে একটি সমাপ্ত বিপ্লব হিসেবে ঘোষণা করাও হবে অবিবেচনাপ্রসূত কাজ। বরং, একথাই ব্যক্ত করা সমীচীন হবে যে, ‘জুলাই বিপ্লব’ নামে যে ধারণাটি আজ আলোচিত হচ্ছে, তা মূলত জুলাই-পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষারই প্রারম্ভিক ধাপ।

লিখেছেন, এস. বি. ফররুখ হোসেন (রিফু) সাহিত্যিক ও সাবেক সভাপতি- রাষ্ট্রচিন্তা চবি

আপনার লেখা আলাপ-এ প্রকাশের জন্য boithak.office@gmail.com -এ পাঠান।