ফিলোসোফি, সাইন্স, ক্যাপিটালিজম অ্যান্ড ট্রুথ
জিজেক শুরু করছেন সমগ্র ফিলোসফির ইতিহাসকে খুবই মোটাদাগে দুইটা এপ্রোচের মধ্যে ভাগ করে—ট্রান্সেন্ডেন্টাল এপ্রোচ: যা কিনা চিন্তাভাবনা করে সেই সম্ভাব্যতার দিগন্ত নিয়ে যেই দিগন্তের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট বাস্তবতার উদয় সম্ভব হতে পারে, একটা “সত্য” কোন কাঠামোর মধ্যে আদও সত্য হিসাবে অর্থবহ বিবেচিত হতে পারে তা নিয়ে; আর অন্টোলজিকাল বা অন্টিক এপ্রোচ: যা চিন্তা করে বাস্তবের সমগ্রতা নিয়ে, বিইং এর সমগ্রতা বা টোটালিটি শুরুতে অস্তিত্বে আসলোই বা কীভাবে, অস্তিত্বের উৎস কী, তা নিয়ে।
এই দুইটা এপ্রোচের মধ্যে যে আপাত অমোচনীয় ব্যবধান, হাইডেগার সেটাকে নাম দিলেন “অন্টোলজিকাল ডিফ্রেন্স”, জিজেক দেখছেন যে বিংশ শতাব্দীতে এই দুই এপ্রোচ মুখোমুখি দাঁড়ায় তাদের সর্বোচ্চ বিকশিত পর্যায়ে—হাইডেগারের মধ্যে ট্রান্সেন্ডেন্টাল এপ্রোচ আর অপরদিকে অন্টিক এপ্রোচের দায়দায়িত্ব নেয় ন্যাচারাল সাইন্স, বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের অনেকে বলে যে এই অন্টোলজিকাল ডিফ্রেন্সের সমস্যাটা আদও কোনো সমস্যাই না, স্টিফেন হকিং যেমন তার বইয়ে ফিলোসফির মৃত্যু ঘোষণা করে ফেলেন। কিন্তু ফিলোসফিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার দুই পৃষ্ঠা পরেই তিনি বলে বসেন যে তার এসব আলোচনার ভিত্তি হলো মডেল-বেস্ড রিয়্যালিজম।

অনেকে আবার আরেকটু নুয়ান্স্ড অবস্থান নেন, তারা ফিলোসফিকে কিছু জায়গা ছেড়ে দিতে রাজি। তারা বলেন যে একটা ফিলোসফিকাল জিজ্ঞাসা যখন এর চূড়ান্ত পরিণত অবস্থায় পৌঁছায়, তখন তা বিজ্ঞানের আওতায় চলে যায়, আর তখন ফিলোসফির উচিত ওইটা নিয়ে আর চিন্তাভাবনা না করে বিজ্ঞানের উপর সেটা ছেড়ে দেয়া। একটা ফিলোসফিকাল জিজ্ঞাসা বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের বিষয়ে পরিণত হওয়ার পরও যেসব ফিলোসফার ওই সমস্যা নিয়ে পড়ে থাকেন, বিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তারা সিম্পলি হার মানতে নারাজ পার্টিজান বাদে কিছুই না। প্যারাডক্সিকালি, এই মতানুসারে, যত বেশি ফিলোসফার একটা বিষয়ের পিছনে লেগে থাকবে, সেই বিষয়টা ততটাই ফিলোসফির আওতার বাইরে। এই প্রস্তাবিত সমাধানকে প্রব্লেমেটাইজ করতে জিজেক প্রশ্ন করছেন যে বিজ্ঞান তার বর্তমান তাৎপর্যের অবস্থানে পৌঁছালোই বা কীভাবে? আর সেটা বুঝতে গেলে যেতে হবে বিজ্ঞানের সাথে পুঁজিবাদের সম্পর্কের আলোচনায়।

বিজ্ঞান যে নিজেকে পুঁজিবাদের জন্য নিয়োজিত আর উৎসর্গ করতে পারে, তা সম্ভব হয় কারণ বিজ্ঞান তার অস্তিত্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত নিয়ে অজ্ঞ থাকতে বাধ্য। লাকাঁ এই ঘটনাটাকে ফর্মুলেট করেন নানা ভাবে—বিজ্ঞান সাব্জেক্টের মাত্রাটাকে ফরক্লোজ করে, বিজ্ঞানের কারবার সত্য নিয়ে না বরং জ্ঞান নিয়ে, বিজ্ঞানের কোনো স্মৃতি নাই।
একটা বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত কীভাবে জন্ম নিলো, বিজ্ঞান তা ভুলে যেতে বাধ্য। আর এই ভুলে যাওয়াটাই এর শক্তির জায়গা, এর অব্জেক্টিভিটি বা নৈর্ব্যক্তিকতার প্রতি যে দাবি তার ন্যায্যতার উৎস। বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তটা কে উচ্চারণ করলো, কোন প্রেক্ষাপটে তা গঠিত হলো, সেই প্রেক্ষাপটের বিভিন্ন মাত্রা যেমন সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক আর ব্যক্তিক, বিজ্ঞান সেসবের প্রতি নির্বিকার। একটা গবেষণা যে ই করুক, যেখানেই করুক আর যেভাবেই করুক, সেটা সবসময় একই সিদ্ধান্ত দিচ্ছে কিনা বিজ্ঞানের আগ্রহের জায়গা সেটা। তবে লাকাঁর চিন্তা হলো, আধুনিক বিজ্ঞান তো ইতিহাসের একটা পর্যায়ে অস্তিত্বে এসেছে, তাহলে তা সম্ভব হওয়ার জন্য সাব্জেক্টের মধ্যে কী কী পরিবর্তন আসতে হয়েছিলো? আধুনিক বিজ্ঞান যেই সাব্জেক্টিভিটির সাথে কোরিলেটেড, তার বিশেষত্ব কী? অবশ্য লাকাঁ এখানে বিজ্ঞানের নৈতিক দায়দায়িত্ব নিয়েও আলোচনা করছেন না।
প্রথমত, বিজ্ঞানকে আশ্রয় করে যেসব বিপর্যয়, সেগুলিকে শুধু বিজ্ঞানের অপব্যবহারের নির্দিষ্ট কিছু ঘটনা হিসাবে বা নৈতিক বিপর্যয় হিসাবে পড়া সম্ভব না। সমস্যাটা আরো সাধারণ পর্যায়ে, বিজ্ঞানের কার্যকর হওয়ার ধরনের মধ্যেই। দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞানকে এডর্নো-হর্কহাইমারের মতো করে স্রেফ ইন্সট্রুমেন্টাল রিজন হিসাবে—বিজ্ঞানের একমাত্র আর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কেবলই প্রকৃতিকে মানুষের অধীনস্থ করা—পড়াও সম্ভব না।জিজেকের মতে সমস্যাটা বিজ্ঞানের সাথে পুঁজির সংযোগের জায়গায়। লাকাঁ যে পর্যায়টা নিয়ে চিন্তিত তা জ্ঞান আর সত্যের মধ্যে একটা সুস্পষ্ট তফাতের পর্যায়।
জ্ঞান আর সত্যের মধ্যে তফাৎটা ধরতে আমরা একটা উদাহরণ দেখতে পারি—নাৎসি জার্মানিতে ইহুদিদের বিরুদ্ধে যেসব প্রোপাগান্ডা চালানো হতো, সেগুলির অব্জেক্টিভ ভ্যালিডিটি খুঁজতে যাওয়াই বোকামি, কারণ যদি ইহুদিদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ বাস্তবও হয়, তবুও নাৎসিদের ইহুদি-বিদ্বেষ প্যাথলজিকাল। কারণ সেই ইহুদিবিদ্বেষটা জড়িত নাৎসি সাব্জেক্টিভিটির সাথে, কেন একজন নাৎসির জন্য ফিগার অফ দ্য জ্যু আবিষ্কার করে যাবতীয় সমস্যার দায় তার উপর চাপিয়ে তাকে নিধনযোগ্য শত্রু হিসাবে মানা আবশ্যক? আর তাই অব্জেক্টিভ একটা গবেষণায় যদি ওইসব প্রোপাগান্ডার বাস্তবতা খুঁজেও পাওয়া যায়, সেটা “জ্ঞান” হিসাবে বিবেচিত হলেও স্ট্রিক্ট সাইকোএনালিটিক সেন্সে সেটা ওইসব প্রোপাগান্ডাকে “সত্য” প্রমাণ করেনা। সত্যের এই পর্যায়টা বিজ্ঞানের ধরাছোয়ার বাইরে, যেই পর্যায়টা সেই সত্য উচ্চারণকারী সাব্জেক্টের অবস্থানের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই অর্থেই, আধুনিক বিজ্ঞান সেই পর্যন্ত “অসত্য” যেই পর্যন্ত সে পুঁজির সার্কুলেশনে নিজের আত্মীকৃত হওয়ার প্রতি নির্বিকার। মার্ক্সীয় পরিভাষায় যেটাকে বলা হতো বিজ্ঞানের “সোশ্যাল মিডিয়েশন”—বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি যেভাবে পুঁজিবাদের সাথে সম্পর্কিত—বিজ্ঞান সেটার প্রতি অজ্ঞ থাকতে বাধ্য। এখানে মাথায় রাখা দরকার যে বিজ্ঞানের এই সোশ্যাল মিডিয়েশন বিজ্ঞানের অভ্যন্তরীণ ফাংশনিং এর বহিস্থ কোনো ঘটনামাত্র না, এটা সেই সম্ভাব্যতার দিগন্ত যার মধ্যে বিজ্ঞান আদও সম্ভব হয়ে ওঠে, এটা বিজ্ঞানের ট্রান্সেন্ডেন্টাল এপ্রায়রি। পুঁজির সাথে এই সম্পর্ক ছাড়া বিজ্ঞানের ফাংশন করাই সম্ভব না। ফলে বিজ্ঞানীরা তাদের আবিষ্কারের নানাবিধ অপব্যবহার সম্পর্কে নির্বিকার থাকাটা স্রেফ উপরি কোনো ঘটনা না, এটা বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার গাঠনিক শর্ত, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসার পরিচালক শক্তি।
এইসব আলোচনার সিদ্ধান্ত এই না যে আমাদের বিজ্ঞানকে ছেড়ে যেতে হবে, বরং বিজ্ঞানকে ছাড়া আমরা কখনোই পুঁজির সমস্যার সমাধান করতে পারবোনা। কারণ যদিও বর্তমানে আমরা পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে শুরু করে নিউক্লিয়ার বিপর্যয় পর্যন্ত যাবতীয় যেসব হুমকির সম্মুখীন, সেসবের পিছনে বিজ্ঞানের সরাসরি দায় আছে, কিন্তু একইসাথে এইসব বিপর্যয়ের বাস্তবতা কতখানি তা বুঝতেও আমাদের বিজ্ঞানেরই আশ্রয় নিতে হবে। বিজ্ঞানই এইসব সমস্যার সৃষ্টি করেছে, কিন্তু এইসব সমস্যাকে বিজ্ঞান ছাড়া বোঝাই সম্ভব না, সমাধান তো দূরের বিষয়। বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে আমরা এমন অনেক সমস্যার অস্তিত্ব যে আছে তা ই জানতে পারবোনা।
এই সমস্যার সমাধান তাই আধুনিক বিজ্ঞানকে ছেড়ে প্রাগাধুনিক জীবনবীক্ষায় ফিরে যাওয়া না, যেখানে প্রকৃতিকে দেখা হয় একটা হার্মোনিয়াস টোটালিটি হিসাবে, মাদার নেচার হিসাবে, যে কিনা নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ আর নিজেই নিজের ভারসাম্য রক্ষা করতে সক্ষম। প্রাগাধুনিক এই দর্শনের কাছে ফিরে গিয়ে আমরা কখনোই আমাদের বর্তমান সমস্যার সমাধান তো দূরে থাক, মাত্রাই উপলব্ধি করতে পারবোনা—আধুনিক বিজ্ঞান নেচারকে পুরোপুরি ডিন্যাচারালাইজ করে ফেলেছে, আধুনিক বিজ্ঞানের পরে নেচারকে আর স্বয়ংসম্পূর্ণ হার্মোনিয়াস টোটালিটি হিসাবে দেখা সম্ভব না। যদি আমরা সমস্যাকেই সঠিকভাবে বুঝতে না পারি, তার সমাধানও সম্ভব না। পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য প্রথমে তাই আমাদের বিজ্ঞানের ক্ষমতা আর প্রকৃতির সম্পূর্ণ ডিন্যাচারালাইজেশন মেনে নিতে হবে, প্রাগাধুনিক প্রকৃতি-ফেটিশ থেকে বের হয়ে আসতে হবে, আর সেখান থেকে সামনে আগাতে হবে। আমাদের তাই দরকার এমন একটা বিজ্ঞান যা কিনা একইসাথে পুঁজির সার্কুলেশনের বাইরে আর প্রাগাধুনিক ফ্যান্টাসি থেকে মুক্ত।
ফিলোসফিতে সত্য ধারণাটার এমন কিছু প্রয়োগ আছে যাকে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানে সংকুচিত করা যায়না, এমন দুইটা উদাহরণ হলো সাইকোএনালাইসিস আর মার্ক্সবাদ। ফ্রয়েড ভাবতেন যে সাইকোএনালাইসিস একটা বিজ্ঞানই, আর ভবিষ্যতে যখন নিউরোসাইন্স যথেষ্ট বিকশিত হয়ে যাবে তখন আর সাইকোএনালাইসিসের দরকার থাকবেনা। কিন্তু লাকাঁ বুঝতে পারলেন যে বিষয়টা এত সহজ না। তিনি “সত্য” ধারণাটার উপর এরিস্টটলের যে কার্যকারণের চারটা ধরন, চারটা মোড অফ কজালিটি, সেটা প্রয়োগ করলেন।

চারটা ধরন হলো—ম্যাটারিয়াল কজ, ফর্মাল কজ, এফিশিয়েন্ট কজ আর ফাইনাল কজ। একজন কাঠমিস্ত্রী যদি একটা কাঠের টেবিল বানায় তাহলে কাঠ হলো ওই টেবিলটার ম্যাটারিয়াল কজ, কাঠমিস্ত্রীর মাথায় যে টেবিলের আইডিয়া, সেটা হলো ফর্মাল কজ, কাঠমিস্ত্রীর কাজ হলো টেবিলের এফিশিয়েন্ট কজ আর টেবিলটার ব্যবহার বা এর উদ্দেশ্য হলো এর ফাইনাল কজ।এখন সত্য বলতে আমরা সাধারণত বুঝি আমাদের চিন্তা বাস্তবের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া, একটা বস্তু সম্পর্কে আমাদের ধারণা ওই বস্তুটার বাস্তবতার সাথে মিলে যাওয়া। কিন্তু হেগেল বলছেন যে সত্যের একটা উচ্চতর পর্যায় আছে যেখানে একটা বস্তুর সত্যতা সেই বস্তুর আইডিয়া/কন্সেপ্টকে বাস্তবায়িত করার উপর নির্ভরশীল। মানে, বস্তুটা “সত্য” হবে যদি সে তার নিজের আইডিয়াল কন্সেপ্টকে যথেষ্ট পরিমাণে ধারণ করতে পারে। যেমন—টেবিলটা আদও টেবিলই হবেনা যদি সেটা টেবিলের আইডিয়াল কন্সেপ্টের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়।
জিজেক সত্যের এই দুইটা পর্যায়ের সাথে এরিস্টটলের ম্যাটারিয়াল আর ফর্মাল কজের তুলনা করছেন—আমরা যখন একটা চিন্তাকে তার অব্জেক্টের বাস্তবতার সাথে বা আইডিয়াকে ম্যাটারিয়াল রিয়েলিটির সাথে তুলনা করে সত্যতা নিরূপণ করছি তখন সেটা ম্যাটারিয়াল কজের মতো কাজ করছে, আর ফর্মাল কজ হলো যখন একটা বস্তুকে তার আইডিয়াল কন্সেপ্টের সাথে তুলনা করছি। এই দুইটাই চরিত্রে খুবই এম্পিরিকাল, দুইটাই এম্পিরিকাল বাস্তবতা নিয়ে চিন্তিত। আর বিজ্ঞানে সত্যের যে ধারণা তা ক্রিয়াশীল হয় এই দুইটার মাঝামাঝি। বিজ্ঞানে অনেকগুলি পর্যবেক্ষণকে ব্যাখ্যা করতে যেমন সেগুলিকে একটা সাধারণ তত্ত্বের অধীনে আনা হয়, আবার এমনও হয় যে একটা তত্ত্ব প্রস্তাব করে তারপর আমরা পর্যবেক্ষণ করে সেটার ফলাফলকে তত্ত্বের সাথে মিলাতে যাই, বিজ্ঞানে এই দুইটা একইসাথে ঘটে। সত্যের এই দুই ধরনের ফাংশনালিটির বাইরে ধর্মের ক্ষেত্রে কার্যকর হয় ফাইনাল কজ—একটা চূড়ান্ত পরিণতি, পরকাল বা শেষ বিচারই সত্যের ডোমেইন। সর্বশেষে, সাইকোএনালাইসিস সত্যের যে মোডটা কার্যকর হয় তা হলো এফিশিয়েন্ট কজ।

কীভাবে? প্রথমদিকে ফ্রয়েড মনে করতেন যে এনালিস্যান্ডকে তার সিম্পটমের সঠিক ইন্টারপ্রিটেশনটা জানালেই সেটা এনালিস্যান্ডের অচেতন থেকে সচেতনে চলে আসবে আর সে সুস্থ হয়ে যাবে। কিন্তু ফ্রয়েড দেখলেন যে সবসময় এইটা কাজ করেনা, তখন ফ্রয়েড দুইটা নতুন বিষয় কন্সেপচুয়ালাইজ করলেন—ট্রান্সফারেন্স আর টেম্পোরালিটি। ট্রান্সফারেন্স হলো অচেতনে অতীতের কোনো ঘটনার সাথে যুক্ত বাসনা বা অনুভূতিকে বর্তমান কোনো কিছুর ওপর আরোপ করা, সাইকোএনালাইসিস কাজ করার জন্য এনালিস্যান্ডের ট্রান্সফারেন্স ঘটতে হয় এনালিস্টের সাথে। আর টেম্পোরালিটি মানে এনালিস্যান্ডের সিম্পটমের ইন্টারপ্রিটেশন তখনই কাজ করবে যখন সেটা তাকে সঠিক সময়ে জানানো হবে, যখন সে সঠিক মানসিক অবস্থায় থাকবে। তাতেও সমস্যার সমাধান হলোনা, ফ্রয়েড তখন আরো দুইটা ধারণা যুক্ত করলেন—এনালিস্যান্ডের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা: একটা সফল এনালাইসিস আসলে এনালিস্যান্ডের কোনো “রোগ” এর “নিরাময়” ঘটায় না, বরং এনালিস্যান্ড তার অচেতনের দ্বন্দ্ব আর বিরোধগুলি সম্পর্কে সচেতন হওয়ার ফলে সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে সে এগুলির সাথে কীভাবে মানিয়ে নিবে, আর নেগেটিভ থেরাপিউটিক ইফেক্ট: এনালিস্যান্ড আসলে একটা পর্যায়ে তার সিম্পটমকে উপভোগ করে, সেক্ষেত্রে সিম্পটম নাই হয়ে গেলে সেটা বরং একটা মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ফ্রয়েডের এত পরিশ্রম আসলে ইঙ্গিত করে যে সাইকোএনালাইসিসের ক্ষেত্রে একটা ইন্টারপ্রিটেশনের সত্যতা পুরোপুরি নির্ভর করে সাব্জেক্টের উপর সেই ইন্টারপ্রিটেশন কী প্রভাব ফেললো তার উপর। ফলে এখানে সত্য নিজেই একটা কজ যা কিনা একটা ইফেক্ট জন্ম দিচ্ছে। সত্য এখানে খুবই প্রাগম্যাটিকালি ফাংশন করে—যা কার্যকর তা ই সত্য, অথবা ইন্টারপ্রিটেশনটা সত্য নাকি মিথ্যা সেই প্রশ্নটাই অবান্তর, ইন্টারপ্রিটেশনটা যে কাজ করেছে সেটাই মুখ্য। এই কারণেই এটা সত্যের এফিশিয়েন্ট কজের মোড, কাঠমিস্ত্রীর কাজ যেভাবে টেবিলের এফিশিয়েন্ট কজ, সত্যের মানদণ্ড এখানে কার্যকারিতা।সাইকোএনালাইসিসে সত্য শুধু প্রাগম্যাটিকালি “ফাংশন” করে, কিন্তু তার মানে এই না যে সাইকোএনালাইসিস প্রাগম্যাটিজমে সাবস্ক্রাইব করে। প্রাগম্যাটিজমে সত্যের কারবারের সাথে সাইকোএনালাইসিসে সত্যের কারবারের পার্থক্যটা খুবই স্পষ্ট। বিষয়টা এমনভাবে ফাংশন করে যেন একটা সিম্পটম সে যেটার সিম্পটম তার পূর্ববর্তী, সিম্পটম যেন আগে আসে আর সিম্পটমটা যার সিম্পটম সেটা যেন পরে আসে। ফলে সেই সিম্পটমের কোনো সঠিক ইন্টারপ্রিটেশন—সিম্পটমটা আসলে কীসের সিম্পটম সেটা—পূর্ব-নির্ধারিত না, সেটা নির্ধারিত হয় সেই ইন্টারপ্রিটেশন কার্যকর হওয়ার মুহূর্তে। লাকাঁ এটাকে তুলনা করেন টাইম ট্রাভেলের সাইন্স ফিকশনের সাথে—সিম্পটমটা যেন ভবিষ্যত থেকে, সিম্পটমটা ইন্টারপ্রিটেড হওয়ার সময়কাল থেকে, পাঠানো একটা বার্তা।
বিজ্ঞান এই কজ হিসাবে সত্যের ব্যাপারে একদমই মাথা ঘামায় না, একটা বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত কোন সাব্জেক্টিভ পজিশন থেকে উচ্চারিত হলো সেইটার কোনো গুরুত্ব নেই। যে কেউ একটা গবেষণার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে ওই সিদ্ধান্তের সত্যতা নিরূপণ করতে পারে। এটাই বিজ্ঞানের সাব্জেক্টকে ফরক্লোজ করে দেয়া। একবার যখন একটা বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত সুগঠিত হয়ে যায়, তখন সেই সিদ্ধান্তটা কীভাবে এসেছে বিজ্ঞান সেটা ভুলে যায়।

লাকাঁ এখানে মার্ক্সবাদের সাথে সাইকোএনালাইসিসের একটা সাদৃশ্য টানেন—উভয়েই সত্যের একই মোডালিটিকে কাজে লাগায়, তবে একটু ভিন্ন ভাবে। মার্ক্সবাদের বাইরে মার্ক্সবাদের সত্যতা বোঝা সম্ভব না। মানে এটা কখনোই সম্ভব না যে আমি একটা নিউট্রাল পজিশনে দাঁড়িয়ে মার্ক্সবাদের বিচার-বিশ্লেষণ করে সেটার সত্যতা আবিষ্কার করবো আর তারপর মার্ক্সবাদের সাথে নিজেকে যুক্ত করবো। মার্ক্সবাদের সাথে নিজেকে যুক্ত করাই মার্ক্সবাদের সত্যতা উপলব্ধি করার পূর্বশর্ত। মার্ক্সবাদ যে ইউনিভার্সালি সত্য, সেটা বোঝা সম্ভব কেবল একটা পার্টিকুলার সাব্জেক্টিভ পজিশন থেকে। সত্য এখানে সবসময় পক্ষপাতদুষ্ট। সিম্পটমের ইন্টারপ্রিটেশনের সত্যতা যেভাবে তার কার্যকারিতার দ্বারা নির্ধারিত হয় আর তখনই সেই সিম্পটম যার সিম্পটম সেটা নির্ধারিত হয়, ঠিক সেভাবেই মার্ক্সিজমের সত্যতা বোঝা যায় মার্ক্সবাদে প্রবেশের দ্বারা আর তখনই সেই সাব্জেক্টিভ পজিশনটা অস্তিত্বে আসে যেখান থেকে মার্ক্সবাদকে সত্য হিসাবে উপলব্ধি করা সম্ভব। আর এই কারণেই স্টালিনিজম আর অর্থোডক্স মার্ক্সিজম যখন মার্ক্সবাদকে একটা অব্জেক্টিভ বিজ্ঞান হিসাবে তত্ত্বায়িত করে তখন সেটা মার্ক্সবাদের এই একেবারে মৌলিক শর্তটাকেই নাকোচ করে ফেলে।
*ভবচক্রের ফেসবুক পেজে প্রথম প্রকাশিত এই লেখাটি লেখকের অনুমতিক্রমে বৈঠকের ওয়েবসাইটে পুনঃপ্রকাশ করা হলো।
লিখেছেন, তাহসিন আহমেদ অমি (শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)
আপনার লেখা আলাপ-এ প্রকাশের জন্য boithak.office@gmail.com -এ পাঠান।