শব্দব্রহ্মের জাগরণ: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভাষার মনস্তত্ত্ব ও দ্রোহের কারিগরি

শব্দব্রহ্মের জাগরণ: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভাষার মনস্তত্ত্ব ও দ্রোহের কারিগরি

একটি জাতির রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আসে, যখন প্রচলিত অস্ত্র, অর্থ বা বাহুবলকে ছাপিয়ে কেবল শব্দ হয়ে ওঠে সবচেয়ে শক্তিশালী বারুদ। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনই এক অভূতপূর্ব ভাষাতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাঁকবদল। আপাতদৃষ্টিতে অনেকে এটাকে কেবলই স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণমানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ মনে করে; কিন্তু আরেকটু তলিয়ে দেখলে বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই আন্দোলনে মূলত ভাষা ও বয়ানের এক মহাকাব্যিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে বলে মনে হয়। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে রাষ্ট্র ও ক্ষমতার অলিন্দে যে জীর্ণ, কৃত্রিম এবং একপেশে ভাষার আধিপত্য তৈরি হয়েছিল, তরুণ প্রজন্ম অত্যন্ত সচেতনভাবে এবং অবলীলায় সেই ঔপনিবেশিক ভাবনালব্ধ বয়ানকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। তারা বিনির্মাণ করে এমন এক নতুন প্রাতিস্বিক ও দ্রোহী ভাষা, যা কোটি কোটি মানুষের সুপ্ত অবদমনকে এক লহমায় মুক্ত করতে পেরেছিল।

ছবি: নয়া দিগন্ত

ভাষা কীভাবে একটি গণঅভ্যুত্থানের চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে, তা বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার ভাষা-কাঠামোকে। যেকোনো একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্র তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এক ধরনের ভয়ের ভাষা এবং একচেটিয়া আখ্যান তৈরি করে। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর ডিসকোর্স ও ক্ষমতার তত্ত্বের দিকে তাকালে আমরা দেখব, ক্ষমতাবানরা সবসময় ভাষার ওপর নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়, যাতে সত্যের সংজ্ঞা তারাই নির্ধারণ করতে পারে। জুলাইয়ের পূর্বেও আমরা দেখেছি, যেকোনো যৌক্তিক দাবি বা ভিন্নমতকে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে তকমাযুক্ত করে দেওয়া হতো। এই একঘেয়ে এবং আধিপত্যবাদী ভাষার সমান্তরালে ছাত্র-জনতা যখন রাজপথে নামল, তারা ক্ষমতার সেই চাতুর্যপূর্ণ বয়ানকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করল। শাসকগোষ্ঠী যখন একটি নির্দিষ্ট শব্দ বা বিশেষণের আড়ালে আন্দোলনকারীদের নাগরিক পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইল, তরুণরা সেই অবমাননাকর শব্দকেই বুক পেতে নিয়ে তাকে নিজেদের আত্মমর্যাদার প্রতীকে রূপান্তরিত করল। যেমন: “তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার। কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার।”

ছবি: দৈনিক সংগ্রাম

এই যে তীব্র স্লোগান, এটা শুধুমাত্র রাজপথের জন্য বরাদ্দ ছিল না; বরং এটি ছিল রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া পরিচয়ের বিরুদ্ধে সামষ্টিক মনস্তত্ত্বের এক চরম প্রত্যাখ্যান। এই ভাষিক প্রতিরোধের কারণেই রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের তৈরি করা ভয়ের সংস্কৃতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।


জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভাষার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক ছিল এর ঋজুতা, শ্লেষ এবং তীব্র নান্দনিক প্রকাশ। গতানুগতিক রাজনৈতিক দলগুলোর মঞ্চ কাঁপানো, দীর্ঘায়িত এবং আলংকারিক বক্তৃতার যে ক্লিশে ভাষা, তরুণ প্রজন্ম তাকে একপাশে সরিয়ে রেখে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, অথচ গভীর ব্যঞ্জনাময় শব্দবন্ধ ব্যবহার শুরু করল। ভাষাবিজ্ঞানী মিখাইল বাখতিন ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াইতে এক ধরনের কার্নিভালেস্ক, বা উৎসবমুখর দ্রোহের কথা বলেছিলেন, যেখানে ব্যঙ্গ, কৌতুক আর শ্লেষের মাধ্যমে অধস্তন সমাজ ক্ষমতার জাঁতাকলকে উপহাস করতে শেখে। তিনি বলেন,

“Carnival is not a spectacle seen by the people; they live in it, and everyone participates because its very idea embraces all the people. While carnival lasts, there is no other life outside it. During carnival time life is subject only to its laws, that is, the laws of its own freedom.”

জুলাইয়ের গ্রাফিতি, দেয়াললিখন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ডিজিটাল ক্যানভাসে ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছিল। তারা এমন সব শব্দমালা প্রসব করল, যা ছিল একাধারে কাব্যিক এবং তীব্রভাবে অন্তর্মুখী। “বিকল্প কে? বিকল্প জনতা”, “পানি লাগবে, পানি?”, কিংবা “রক্তাক্ত জুলাই”—এই ছোট ছোট বাক্যগুলোর ভেতরে যে মনস্তাত্ত্বিক তাড়না ও আর্জি লুকিয়ে ছিল, তা মুহূর্তের মধ্যে আপামর জনসাধারণের মজ্জায় এক সম্মোহনী শক্তির মতো প্রবেশ করেছিল। এখানে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা নিজেই হয়ে উঠেছিল এক প্রদীপ্ত হাতিয়ার। ব্যঙ্গকৌতুক, মিম আর তীব্র পরিহাসের মাধ্যমে তরুণরা ক্ষমতার অহংকারকে যেভাবে নগ্ন করেছিল, তা সাধারণ মানুষকে ঘর থেকে বের করে আনার জন্য যথেষ্ট ছিল। কারণ, এই প্রথম সাধারণ নাগরিকরা অনুভব করেছিল, এই নতুন ভাষা তাদের এতদিনের জমে থাকা বোবা ক্ষোভের আসল প্রতিবিম্ব।

পোস্টস্ট্রাকচারালিস্ট, বা উত্তরগঠনবাদী, তাত্ত্বিক জাক দেরিদার ডিকনস্ট্রাকশন, বা পাঠবিনির্মাণের, ধারণাকে এখন স্মরণ করলে দেখা যায়, জুলাইয়ের বিপ্লবীরা রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট কিছু বায়নারি, বা দ্বান্দ্বিক, বয়ানকে পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছিল। রাষ্ট্র যা-কিছুকে আইনি ও পবিত্র বলত, তরুণরা তার ভেতরের প্রাতিষ্ঠানিক জুলুমকে উন্মোচন করে দেখিয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতির একটি চিরন্তন দ্রোহের ঐতিহ্য রয়েছে, যা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত। জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে শব্দের এই অব্যর্থ প্রয়োগ মূলত সেই ঐতিহ্যেরই এক আধুনিকতম ও প্রযুক্তিনির্ভর সংস্করণ। তবে এবারের বিশেষত্ব ছিল ভাষার গণতান্ত্রিকীকরণ। কোনো নির্দিষ্ট নেতা বা তাত্ত্বিকের ল্যাবরেটরিতে এই ভাষা তৈরি হয়নি; এটি তৈরি হয়েছে রাজপথের ধুলোয়, বুলেটের মুখে দাঁড়িয়ে এবং যৌথ চেতনার অবিনাশী তাগিদে। দেয়ালের প্রতিটি অক্ষরে, প্ল্যাকার্ডের প্রতিটি ছত্রে যে ক্ষোভ ও প্রত্যয় ফুটে উঠেছিল, তা ছিল একাধারে কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে চপেটাঘাত এবং একটি মানবিক ও সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মাণের আকুল আকাঙ্ক্ষা।

পরিশেষে বলা যায়, ইতালীয় মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামশির হেজেমনি, বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের, যে ধারণা, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল তার বিরুদ্ধে এক সফল কাউন্টার হেজেমনি, বা প্রতি আধিপত্যের, লড়াই। এই আন্দোলন কেবল একটি সরকারের পতন ঘটায়নি; তা আমাদের ভেতরের জড়তাগ্রস্ত মনস্তত্ত্ব ও দাসত্বমূলক ভাষারও পতন ঘটিয়েছে। এই আন্দোলন প্রমাণ করেছে যে, বন্দুকের নলের চেয়েও কলমের কালি, তুলির আঁচড় এবং মুখের অকুতোভয় শব্দ অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে। শব্দের এই অলৌকিক কারিগরিই কোটি মানুষের বিক্ষিপ্ত আকাঙ্ক্ষাকে একটি সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছিল। জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে ভাষা নিজেই হয়ে উঠেছিল এক অবিকল্প ও সার্বভৌম বিপ্লব, যার রেশ আমাদের জাতীয় জীবনে ও মননে বহুকাল ধরে প্রতিধ্বনিত হবে।

লিখেছেন, সিয়াম আল জাকি

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার লেখা আলাপ-এ প্রকাশের জন্য boithak.office@gmail.com -এ পাঠান।