ট্রেন্ড বা প্রবণতা, ঐতিহ্যের পুনরাবিষ্কার ও পুনঃপ্রাসঙ্গিকীকরণ
বিশ্বজুড়ে অসংখ্য জাতিসত্ত্বার অজস্র ঐতিহ্যবাহী পোশাক আছে। এই পোশাক গুলো জাতিগত পরিচয়ের সূক্ষ্ম উপাদান। আদিকাল থেকে এসব পোশাক, বস্ত্র তৈরি হয়ে আসছে স্থানীয় জ্ঞান (Indigenous Knowledge), জলবায়ু, ব্যবহার অভিজ্ঞতা ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে। পশ্চিমা ধাঁচ এখন প্রায় সকল সংস্কৃতিতে মিলেমিশে গেছে, পোশাকের ওপর এর প্রভাব বেশ ভারী। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঐতিহ্যবাহী পোশাক হারিয়ে যায়নি। সেগুলো এখনো মানুষের জাতিগত পরিচয়, আবেগের সাথে জড়িত। এশিয়া জুড়ে বিগত কিছু বছর যাবত একরকম পুনরুজ্জীবন, পুনরাবিষ্কার, পুনরায় প্রাসঙ্গিককীকরন এর উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি চায়নিজ কিছু অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ফিচারে দেখা যায়, চায়নাতে ঐতিহ্যবাহী পোশাকের জনপ্রিয়তা বাড়ছে, এবং সেটা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। অনেক তরুণ-তরুণীই "হানফু" -র মত ঐতিহ্যবাহী পোশাক প্রতিদিন ব্যবহারের জন্য বেছে নিচ্ছে। বিষয়টা যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং। কারণ চায়না, কোরিয়ার মত অনেক পূর্ব এশিয়ার দেশই গত কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা পোশাকের অভ্যস্ত। তারা ঐতিহ্যবাহী পোশাকগুলো ধর্মীয় উৎসব, বিয়ে কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সময়ই ব্যবহার করে শুধু। এসব পোশাক দৈনন্দিন ব্যবহারের পোশাকের তালিকা ছেড়েছে বহু আগেই।

এশিয়া আকারে অতিরিক্ত বড় হলেও মোটামুটি সংস্কৃতির সূত্র কাছাকাছি বাধা কোথাও না কোথাও থেকে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে ট্রেডিশনাল ওয়্যের আদতে কখনো ছেড়ে যায়নি। আমাদের প্রবীন জনগোষ্ঠী এখনো যত্ন করে ধরে রেখেছেন। প্রবীন পর্যন্ত যাবার খুব দরকার পড়ে না। আমাদের অল্পবয়সী জনগোষ্ঠীও স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে এসব পোশাক পরে আসছে। যেমন বাঙালী নারীদের শাড়ির সাথে লেনদেন বুঝতে শেখার পর থেকেই। মায়ের আঁচলে নিজেকে বাধা কিংবা নিজেকে সেই আঁচলে দেখার একটা বিষয় বরাবরই থাকে। আর বাংলাদেশে এখনো ছেলেদের জন্য শুক্রবার মানেই পাঞ্জাবী-পাজামা। আর্থ-সামাজিক কারণ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক মনোভাব ইত্যাদি ইত্যাদি জটিল আলোচনায় না যাই। মনে হয় না গত দশকের আগে বাংলাদেশে পশ্চিমা পোশাকের খুব চল ছিল। আমাদের বাবা দাদারা কর্মক্ষেত্রের খাতিরে প্যান্ট শার্ট স্যুট পরতেন ঠিকই, কিন্তু সেগুলোও আমাদের খুবই নিজস্ব টেক্সটাইল আর ছাঁটে মডারেট করা। এখানেও খুব কিছু করার বটে ছিল না। কলোনিয়ালিজম আসলে সকল রন্ধ্রে। মোটকথা হচ্ছে পোশাকের পছন্দ থেকে দেশীয় পোশাক কখনো চলে যায় নি। আমাদের মেয়েরা এখনো প্রতিদিন ই শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ পড়েন। পুরুষরা ফতুয়া, পাঞ্জাবী পড়েন। সেটা পূর্ব দিকের মত বিশেষ ভাবে "Traditional wear" হিসেবে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে দেখার মত বিষয় হয় না।
কিন্তু ২০০০ পরবর্তী সময়ে আসলে আস্তে আস্তে একটা পরিবর্তন দেখা গেছে। সেসময়ের তরুণ প্রজন্ম ধীরে ধীরে "মোর কমফোর্টেবল" পশ্চিমা পোশাকের দিকে ঝুকেছে। সেটা তৎকালীন সিনেমা, নাটক-ধারাবাহিক, ওভিসি আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফ্যাশন চয়েস দেখলেই টের পাওয়া যায়। জিনিসটা এক পর্যায়ে "ট্রেডিশনাল পোশাক কম মর্ডান" এ গিয়ে ঠেকেছে। প্রায় এক যুগ সমান লম্বা এই পরিবর্তনটার ধারায় আবারো কিছু পরিবর্তন চোখে পড়ে; কিছুটা চায়নার মতই। কোভিড মহামারী পরবর্তী অনলাইন বিজনেসের প্রসার আর সোশ্যাল মিডিয়া ফ্যাশন ট্রেন্ডের চক্করে মনে হয় ট্রেডিশনাল পোশাকের হঠাৎ প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। গত পাঁচ ছ'বছরে তরুণ প্রজন্মের চাহিদা অনেকে বেড়েছে "ট্রেডিশনাল ওয়্যের" এর। ব্যাপার টা এমন নয় যে তারা ওয়েস্টার্ন ক্লথিং থেকে বেরিয়ে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গামী তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। শাড়ি-পাঞ্জাবীকে সেকেলে পোশাক ভাবার মনোভাব এখন আর একেবারেই দেখা যায়না বললে চলে। বরং এগুলো এখন নতুনভাবে রুচিশীল ফ্যাশন হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে; ক্লাস থেকে অফিস, ফর্মাল থেকে ইনফর্মাল ইভেন্ট, ফ্যাশন শো আর সোশ্যাল মিডিয়া সব জায়গাতেই পাচ্ছে।
বর্তমানে পোশাকের অপশন অনেক বেশি। কালচার মিক্সিং এর কারণে ফ্যাশন আর অপশন দুইটাই অজস্র এখন। তার মধ্যেও যদি তরুণরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক স্বেচ্ছায় বেছে নেয়, যেটা আগের প্রজন্ম করেনি; তাহলে এর অর্থ একটু ভিন্ন ভাবে ভাবতেই হয়।
মোটিভেশন চায়না থেকে কিছুটা আলাদা ভাবে ভাবতেই হবে। কখনো সেভাবে উপনিবেশ না হওয়া চায়নাতে ওয়েস্টার্নাইজেশন ঠিকই ঘটেছে। বরং দীর্ঘকাল ধরে উপনিবেশিত দক্ষিন এশিয়ার চেয়ে অনেক বেশি।

পোশাক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় অংশ গুলোর একটি। পশ্চিমা প্রভাব যেকোন সংস্কৃতিতেই পোশাকের উপর বেশ আগেই পড়ে। পশ্চিমাকরণের ছোঁয়া সবকিছুতে লাগলেও যেহেতু বাংলাদেশে নিজেদের পোশাক টিকে ছিল, মানুষ স্বেচ্ছায়, স্বানন্দে এগুলো বাঁচিয়ে রেখেছে; তাই সমসাময়িক এই উত্থানকে ঠিক Revival বলা যায় না। জেন-জি বরাবরই এক্সপেরিমেন্টাল। ট্রেন্ড ফলো করা, ফ্যাশন এস্থেটিকের জন্য পোশাক নির্বাচন করা তাদের জন্য নতুন বা বিশেষ কিছু না। এই ভাবনা টাও ফেলে দেয়া যায় না। কিন্তু যদি তা আদতে উপকার ই করে, তবে এক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার ভাববার প্রয়োজন কোথায়?
এদিক থেকে সবচেয়ে বড় বিষয় যেটা ঘটছে তা হলো, আমাদের স্থানীয় শিল্পের প্রতি নজর বাড়ছে। গত কয়েক দশকে যে বাংলার উন্নত বস্ত্রশিল্প যথেষ্ট মনোযোগ আর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হারাতে বসেছে; অন্তত সেগুলোর হাত একটু হলেও ধরা গেছে এই সুযোগে। এছাড়াও এর আজকালকার সাস্টেইনেবল ও স্লো ফ্যাশনের প্রচার প্রসারে ভূমিকা তো আছেই। এক্ষেত্রে হতে পারে ঐতিহ্যের পুনঃপ্রাসঙ্গিকীকরণ (Heritage Recontextualization) ঘটেছে।
ব্যাপারটা সহজ ভাষা হলো, পুরনো কোনো ঐতিহ্যকে তার আগের অর্থ ও ব্যবহারে হুবহু ধরে না রেখে সমসাময়িক জীবনধারার সাথে মিলিয়ে নতুন অর্থ দেয়া; নতুনভাবে ব্যবহার করা। আমাদের পোষাকগুলো হয়তোবা একেবারে গোড়া থেকে পুনরায় উঠে আসেনি, বরং তারা সবসময় ব্যবহারের মধ্যেই ছিল। আমাদের মায়েরা হয়ত শাড়ি পরতেন কারন তখন বাজারে নারীদের পোশাক হিসেবে শাড়িই বেশি প্রচলিত ছিল। শাড়ি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য বেশি ছিল, শালীনতার ধারণার সাথে যুক্ত ছিল। এটা সচেতন ও ইচ্ছাকৃত এক্সপ্রেশন ছিল না তাদের জন্য। কিন্তু যখন আজকের দিনে একজন তরুণী হাজারটা অপশনের মাঝে নিজের পরিচয় আর রুচি প্রকাশের জন্য শাড়ি বেছে নেয়, তখন সেটা ভিন্ন বিষয়। এভাবে ঐতিহ্য পুনরায় প্রাসঙ্গিক হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী পোশাক একেবারে হুবহু আগের মত করেই ব্যবহার হচ্ছে না। এতে ফিউশন যুক্ত হয়েছে, সুবিধার ভিত্তিতে পরনের ধরনে পরিবর্তন এসেছে, উপলক্ষ্য থেকে নকশা সবকিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। ঐতিহ্য যখন বাধ্যবাধকতার বদলে স্বেচ্ছায় বেছে নেয়ার বিষয় হয়ে উঠেছে, তখন এটা অবশ্যই নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক।

তবে এতকিছুতে, একটা প্রশ্ন হলো, বর্তমানের শাসন শোষণের জটিল আর ক্লান্ত পুঁজিবাদী পৃথিবীতে, এই পরিবর্তন কি ডিকলোনাইজেশনের ইচ্ছা থেকে আসা? একপ্রকার "Reclaiming Cultural identity"? নাকি স্রেফ ট্রেন্ড?
জ্ঞানকাণ্ড হিসেবে নৃবিজ্ঞানে সংস্কৃতির বড় অধ্যয়ন আছে। মানুষ যা কিছু করে, পরিধান করে, খায় কিংবা পালন করে সবকিছুই সংস্কৃতি। সংস্কৃতি মানুষকে আলাদা করে। সংস্কৃতি হল "Distinctive Identity" এক মূল উপাদান। মানুষ সবসময়ই নিজের একটা আলাদা পরিচয়ে পরিচিত হতে চায়, যা দিয়ে তাকে আলাদা করা যায়। সংস্কৃতি সেই ইচ্ছাকে নাম দেয়। গ্লোবালাইজড পৃথিবীতে আমরা কে? আমাদের পরিচয় কি? আমরা কি নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ে পরিচিত হতে পারি? বা ওয়েস্টার্ন হওয়া ছাড়াও মর্ডান হওয়া সম্ভব কিনা - এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা প্রয়োজন। ট্রেডিশনাল পোশাক সাংস্কৃতিক পরিচয়বোধের একটা বৃহৎ জায়গা। বর্তমানে উদ্ধিগ্ন পৃথিবীতে উপনিবেশ যে সাংস্কৃতিক পরিচয় সংকট তৈরি করেছে, সেখানে নিজস্ব সংস্কৃতিকে পুনরায় গ্রহণ করাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। সকল সংস্কৃতি সমান; একই পরিমাণ সম্মানের দাবীদার। নিজের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, জীবনধারাকে অন্যের চেয়ে উন্নত ভাবা কিংবা তার মানদন্ডে অন্যদের বিচার করার সুপিরিয়র মনোভাবকে বলা হয় জাতিকেন্দ্রিকতা বা Ethnocentrism। সুতরাং প্রতিটি সংস্কৃতিই নিজস্ব ভাবে অনন্য এবং প্রতি সংস্কৃতির মানুষই নিজস্ব পরিচয়ে পরিচিত হবার অধিকার রাখে। এজন্য অন্য সংস্কৃতির মানদণ্ড প্রয়োজন নেই। কোনো সংস্কৃতি কম মডার্ন নয়, আধুনিক পৃথিবীতে অংশ নিতে পশ্চিমা দেখানোর প্রয়োজন পড়ে না।

পোশাক যেহেতু নিজস্ব পরিচয়বোধের ধারনা দেয়; তাই গ্লোবালাইজেশনের যুগে নিজেকে উপস্থাপন আর নিজের সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করার এটা একটা ভাল মাধ্যম হতে পারে। "সকল এশিয়ান একই" ধরনের উপনিবেশিক মনোভাবের একটা কড়া উত্তর এটাই যে সবারই স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় (Distinctive Cultural Identity) আছে। সেটা দিয়েই আমাদের আলাদা করা সম্ভব। নিজেদের বিশ্ব দরবারে পরিচয় করানোর ইচ্ছা থেকেই হোক, কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড এর দরুণ হোক, অনলাইন জগতে বাংলাদেশি সংস্কৃতি, দেশি এস্থেটিক ইত্যাদি নামে একটা আলাদা কালচারাল আইডেন্টিটি এস্টাবলিশ করার অভিপ্রায় বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে লক্ষনীয়। উপায় যা ই হোক, উপকারি হলে মন্দ অন্তত মনে হয় না।
লিখেছেন, মিম মেহেদী ( শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় )
আপনার লেখা প্রকাশের জন্য boithak.office@gmail.com -এ পাঠান